হাসান সিকদার, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৪ ১০:৫৭ এএম
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বংশাই থেকে অবৈধভাবে মাটি তোলার কারণে নদের পাড়ে দেখা দিয়েছে ভাঙন। সম্প্রতি উপজেলার রহিমপুর এলাকায়। প্রবা ফটো
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বংশাই থেকে অবাধে মাটি কাটার কারণে নদীতীরবর্তী এলাকার অনেকের জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এর পরও নদ থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা থেমে নেই। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বাধা দিলে হুমকি-ধমকিসহ নানা ভয়ভীতি দেখানো হয়। নদ পাড়ের ঘরবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, কৃষিজমি ও রাস্তাঘাট ভাঙনের মুখে।
স্থানীয়রা জানান, দেড় মাস ধরে উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের রহিমপুর এলাকায় বংশাই থেকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বালুমাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের স্পট থেকে আধা কিলোমিটার দূরে লতিফপুর-চাঁনপুর সেতুর পাশেই বাল্কহেড রাখা হয়। রাত হলে বৃদ্ধি পায় ড্রেজারের (খননযন্ত্র) সংখ্যা। সুযোগ বুঝে বসতবাড়ির কাছাকাছি ড্রেজিং শুরু করেন মাটি ব্যবসায়ীরা। বালুমাটি লুটপাটকারীদের প্রতিনিধিরা দিন-রাত সেখানে পাহারা দেন। প্রতিবাদ করলে মারপিট ও থানা-পুলিশের ভয় দেখানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানায়, ওই এলাকা থেকে বাল্কহেড ভর্তি বালু পার্শ্ববর্তী গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় বিক্রি করা হয়। প্রতি বাল্কহেড লোড করতে একটি ড্রেজারের ৩০ মিনিট সময় লাগে। একটি বাল্কহেডে প্রায় ৫ হাজার ঘনফুট বালুমটি লোড হয়ে থাকে। প্রতি ঘনফুটের বাজারমূল্য ১২-১৫ টাকা। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৫০-৬০টি বাল্কহেড বালু লোড করা হয়। সে হিসেবে এক দিনেই ২৫-৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সরেজমিনে রহিমপুর এলাকায় গিয়ে জানা যায়, বড় ড্রেজারমেশিন দিয়ে নদের বালুমাটি উঠিয়ে বাল্কহেডে লোড করা হয়েছে। নদ থেকে অবৈধভাবে বালুমাটি কাটার কারণে পাড়ের জমিতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদের পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে ভাঙনের তীব্রতা বাড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা বাছাতন বেগম বলেন, এর আগে বালু তোলা বন্ধ করার জন্য প্রতিবাদ করা হয়েছিল। পরে উত্তোলনকারীদের হুমকিতে ভয়ে আমার স্বামী, ছেলে, দেবর, ভাসুর ১৫ দিন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন। এখনও চলছে বালু তোলার কাজ। এতে নদের পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমাদের বাড়িঘরও হুমকির মুখে রয়েছে।
রহিমপুর গ্রামের আজিজ মিয়া বলেন, অবাধে বালু তোলায় ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে পাড়ের কৃষিজমি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বহু জায়গায় এসব নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি, অভিযোগ দিছি। এতে আমাদের ওপর অনেক বাধা আসে। রাস্তাঘাটে আমাদের হুমকি-ধমকি দেয়। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
নাহিদ হাসান নামে আরেকজন বলেন, বালুমাটি উত্তোলন বন্ধের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জানালেও লাভ হয়নি। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলে দুয়েক দিন বন্ধ রাখা হয়। পরে আবার চলতে থাকে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, গত বছর বালু উত্তোলন বন্ধ করতে যাইয়া মারামারি হইছিল। আমার দুই লাখ টাকা জরিমানা হইছিল। আমারে ধরে নিয়া গিয়ে ৭ দিনের জেল দিয়েছিল। কার কাছে বিচার চাব, টাকার সামনে দুনিয়া অন্ধকার!
স্থানীয় শফিক, লিটন, কাজল ও জোবায়ের একটি সিন্ডিকেট প্রভাব খাটিয়ে বালুমাটি উত্তোলন এবং বিক্রি করছে বলে জানান স্থানীয়রা। বিশেষ করে খামারপাড়া গ্রামের শফিক বালু উত্তোলনের বিষয়টি দেখভাল করেন। ঘটনাস্থলে তাকে না পেয়ে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ নুরুল আলম বলেন, ‘সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ কাজের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, ছাড় দেওয়া হবে না।’