বেতাগীতে রেমালের তাণ্ডব
বেতাগী (বরগুনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৪ ২২:১৩ পিএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪ ১৬:৩৩ পিএম
বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি লঞ্চঘাট এলাকায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এমপির সম্মানে তৈরি করা মঞ্চ। প্রবা ফটো
ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে দেশের উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মঙ্গলবার (৪ জুন) বেলা ২টায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের এই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল।
অবশেষে তিনি না আসায় আশাহত হয়েছে ওই এলাকার জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্থ স্থানীয় বাসিন্দারা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব নুর আলমের (উপসচিব) সই পরিদর্শনের সময় সূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে বেলা ১১টায় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বরগুনা জেলায় সফরের অংশ হিসেবে হেলিকপটারযোগে বরগুনা-২ আসনের পাথরঘাটা উপজেলায় অবতরণের পর কাকচিড়া, কালমেঘা ও একই আসনের বামনা উপজেলা হয়ে বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি এলাকায় বেলা ১১টা থেকে বেলা ২টার মধ্যে যেকোনো সময় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনে আসবেন। প্রতিমন্ত্রীর এ সয়রসূচি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের সব পর্যায়ে অবহিত করা হয়।
সে অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলার সড়িষামুড়ি ইউনিয়নের কালিকাবাড়ী লঞ্চঘাট এলাকায় প্রতিমন্ত্রীর সম্মানে একটি অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়। সকাল ৯টা থেকে ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন সেখানে জড়ো হন। ছুঁটে আসেন প্রশাসন, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সব জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যম কর্মীরা। সকাল থেকে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত বিষখালী নদীর পাড়ে তাদের মধ্যমনি প্রতিমন্ত্রীর অপেক্ষায় থাকে তারা। হঠাৎ করে প্রতিমন্ত্রীর না আসার খবরে সবাইকে হতবাক ও আশাহত করে। বুক ভরা কষ্ট নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানান ক্ষতিগ্রস্থরা।
সড়িষামুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিপন জোমাদ্দার বলেন, ‘আমরা কষ্ট পেয়িছে ও আশাহত হয়েছি। সকাল থেকেই রেমালের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনসহ আমরা প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিলাম। কিন্ত সোয়া ২টার দিকে শুনতে পাই প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আসবেন না। না আসার কষ্ট সবাইকে মর্মাহত করেছে।’
একই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইফসুফ আলী শরীফ বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী মহোদয় না আসায় আমার ক্ষুব্ধ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। মন্ত্রী মহোদয়ের আসার খবরে বিষখালী নদীর ক্ষতিগ্রস্থ এই তীরে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য হাজার হাজার মানুষ নতুন আশায় বুক বেঁধে ছিল। কিন্ত সে আশা পূরণ হলো কই?’
উপজেলার বলাই বুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থী মো. রহমাতুল্লাহ বলেন, ‘আমরা বিষখালী নদীর পাড়ের মানুষ। আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। তাই আশান্বিত ছিলাম মন্ত্রী আসলে দুর্ভোগের লাঘব হবে। সেখা কারণেই আমরা শিশুরাও স্কুল ছেড়ে দলবেঁধে এসে ছিলাম।’
বেতাগী উপজেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি লায়ন শামীম সিকদার বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী না আসার খবরে কষ্ট পেয়েছি। শুনেছি সময় সংকটের কারণে তিনি পাথরঘাটা উপজেলা থেকে নদী পাড়ি দিয়ে আসতে পারেননি। আশাকরি প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আগামীতে তার সুবিধাজনক সময় আালাদাভাবে বেতাগীতে সফর করবেন।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিষখালী নদীর তীরবর্তী সড়িষামুড়ি ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি, কালিকাবাড়ি লঞ্চঘাট, আলীয়াবাদ, গাবতলী, ফকির হাট, বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের তালবাড়ি, বলাইবুনিয়া,বদনীখালী রাজ্জাক মোল্লার বাড়ি হতে স্লুইসগেট পর্যন্ত ৮টি স্থানে ৪ কিলোমিটার কয়েকটি স্থান ক্ষয়ে সরু হয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বাঁধ।
ভাঙনের মুখোমুখোমুখি হয়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে উপজেলার তালবাড়ি গ্রামের ৩২টি পরিবার। এদের মধ্যে জাহাঙ্গীর হাওলাদার রিপন, আবু তালেব মিয়া, জাকির হাওলাদার, রেনু বেগম, রুস্তুম আলী,বাবুল হাওলাদারসহ অন্যান্য পরিবার। তারা জানায়, বাড়ির ভেতরে বড় আকারের ফাটলের সৃস্টি হয়েছে। নদী গর্ভে তাদের বাড়িঘর বিলীন হতে আর সময়ের ব্যাপার মাত্র। এতে প্রতিনিয়ত আতঙ্কেও মধ্যে রয়েছেন উপজেলার বুড়ামজুমদার, কাজিরাবাদ ও সড়িষামুড়ি এই ৩টি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ।
উপজেলার বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ গোলাম রব শুক্কুর বলেন, যেসব স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সেখানে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা দরকার। কারণ জোয়ারের পানিতে ওই বাঁধ আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। যত দেরি হবে সংস্কার কাজে খরচ তত বাড়বে। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমের আগে কাজ শেষ করা না হলে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তালবাড়ির বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম বলেন, আমার জীবদ্দশায় ৪ বার স্থান বদল করেছি। বিষখালী নদীর পারে বসবাস করে আসছি। আমাদের বাঁচার কোনো উপায় নেই। ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময়এই এলাকার বাঁধ পানির চাপে ভেঙে যায়। আমাদের এখানে স্থায়ী বা টেকসই বাঁধ নির্মাণ দরকার। এখানকার জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখতে হলে মজবুত বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ওই এলাকার বাসিন্দা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জেলে আব্দুর রব সিকদার বলেন, ঝড় ও জলোচ্ছাসের সময় কর্তৃপক্ষের বাঁধ নির্মাণের টনক নড়ে। ঝড় থেমে গেলে তাঁদের আর খবর থাকেনা। বর্ষা মৌসুমে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ কারণে বাঁধের স্থায়ীত্ব থাকেনা। বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি না করা হলে উচ্চ জোয়ারে বাঁধ প্লাবিত হয়ে এলাকা প্লাবিত হবে।
উপজেলার কালিকাবাড়ি এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুল মোতালেব বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানিতে সব তলিয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকেই পাউবো দায়সারা বাঁধ নির্মাণ করে। ওই বাধ বেশি দিন আর টিকে থাকেনি।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) টিম লিডার জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, যখন কোনো ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত দেওয়া হয়, তখন সবার টনক নড়ে। এ উপকূলের নদনদীতে স্বাভাবিক জোয়ারে কখনো কখনো ১৫ থেকে ১৮ ফুটের অধিক পানিবৃদ্ধি পায়। জলবায়ূর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও বাঁধের উচ্চতা কম থাকায় উচ্চ জোয়ারে বাঁধ ছাপিয়ে পানি উপচে পড়ে জনবসতিতে প্রবেশ করে। এ উপকূলের বাসিন্দাদের ঝড়, জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য বাঁধের উচ্চতা বাড়ানো প্রয়োজন।
এ বিষয় বরগুনা পানি উন্নয়ন বের্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে এ জেলায় ১২ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা এসব ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছি।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফারুক আহমেদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ এই বাঁধের স্থানগুলো স্বচক্ষে দেখে আমি এসেছি। ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ যাতে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত হয় সে জন্য মঙ্গলবার পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের স্বচক্ষে এই বাঁধ দেখাতে আসার কথা ছিল। কিন্ত তাকে জানানো হয়েছে সময়ের অভাবে তিনি আসতে পারবেন না। পরবর্তীতে আলাদা সময় করে ক্ষতিগ্রস্থ ওই এলাকা পরিদর্শনে আসবেন।