কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৪ ১২:২৩ পিএম
রামু উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমান উল্লাহ। প্রবা ফটো
উপজেলা পরিষদের ষষ্ঠ সাধারণ নির্বাচনে কক্সবাজারের রামুতে দায়িত্ব পালনকারী আনসার-ভিডিপি সদস্যদের কাছ থেকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৯ মে এই উপজেলায় ভোটগ্রহণ হয়। এরপরই রামু উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমান উল্লাহর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন নির্বাচনী দায়িত্বপালনকারী আনসার-ভিডিপি সদস্যরা।
তাদের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার নামে ওই কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেছেন। এমনকি একই নাম একাধিক কেন্দ্রের তালিকায় দেখিয়েও বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। টাকা না দেওয়ায় নির্বাচনী দায়িত্ব পাননি শত শত আনসার-ভিডিপি সদস্য। আবার ঘুষ দিয়ে রামুর নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে যান অন্যান্য উপজেলার আনসার-ভিডিপি সদস্যরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রামু উপজেলা নির্বাচনে মোট ৬৪ কেন্দ্রে ৬৪টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা। প্রতিটি গ্রুপ গঠিত হয় একজন পিসি, দুজন এপিপি, ভিডিপির ৫ থেকে ৮ জন পুরুষ সদস্য ও ৪ থেকে ৫ জন নারী সদস্য নিয়ে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ৬৪টি গ্রুপ থেকে ৬ হাজার টাকা অগ্রিম আদায়ের পর কেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ নির্বাচনে দায়িত্ব বণ্টন বাণিজ্য করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে রামু জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বাসিন্দা দলনেতা শাহজাহানের অধীনে ছিল ৫টি গ্রুপ। এর মধ্যে ১৩ সদস্যের প্রতিটি গ্রুপের জন্য আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা আমান উল্লাহকে ৬ হাজার করে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে তাকে। আবার শাহজাহান নিজেও প্রতিজন সদস্যের কাছ থেকে এক থেকে দেড় হাজার টাকা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, এই ৫টি গ্রুপে যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অধিকাংশ আনসার-ভিডিপির সদস্যই নন।
রাজারকুল ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার আলম শাইর জানিয়েছেন, উপজেলা নির্বাচনে তার ভাই আনসার-ভিডিপি সদস্য মোহাম্মদ আলম একটি গ্রুপ দিয়েছেন। এজন্য আমান উল্লাহ তার ভাইয়ের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে অপর একটি গ্রুপ ১০ হাজার টাকা দেওয়ায় তার ভাইয়ের গ্রুপকে বাদ দেওয়া হয়। পরে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করলে তার ভাইয়ের গ্রুপটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
রাজারকুল ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি দলনেত্রী রেখা বড়ুয়া দুটি গ্রুপের তালিকা করেছিলেন। টাকা দিতে না পারায় ওই তালিকা থেকে অনেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যকে বাদ দিয়েছেন আমান উল্লাহ। ভুক্তভোগী এক সদস্যের সঙ্গে রেখা বড়ুয়ার মোবাইল ফোনে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ওই অডিওতে রেখা বড়ুয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘অফিসে টাকা ছাড়া কাজ হয় না। যারা টাকা দিয়েছে, তাদের ডিউটি দিয়েছে। যারা দেয়নি তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে একসঙ্গে একাধিক কেন্দ্রে একই ব্যক্তির নাম দেখা গেছে। তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, আনসার সদস্য জিহাদুল ইসলামের নাম রয়েছে তিনটি কেন্দ্রের তালিকায়। কেন্দ্রগুলো হচ্ছেÑ দক্ষিণ চাকমারকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ক্রমিক নং ৩), চেইন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ক্রমিক নং ৯) ও রামকোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (৮)। তবে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন।
একইভাবে সাদ্দাম হোসেনের নাম দুটি কেন্দ্রের তালিকায় রাখা হয়। কেন্দ্রগুলো হচ্ছেÑ মনিরঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ক্রমিক নং ৩) ও চেইন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র (ক্রমিক নং ৫)। অভিযোগ উঠেছে, অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই আমান উল্লাহ এভাবে একজনের নাম একাধিক কেন্দ্রের তালিকায় দিয়েছেন।
ক্ষুব্ধ আনসার-ভিডিপি সদস্যরা জানিয়েছেন, টাকা দিতে না পারায় এবার নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি উপজেলার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শত শত আনসার-ভিডিপি সদস্য। অথচ উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা আমান উল্লাহকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে যান মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর ও ঈদগাঁও উপজেলার শতাধিক নারী-পুরুষ। যাদের মধ্যে অনেকের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সনদপত্র ছিল না।
গর্জনিয়া ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রে দায়িত্বরত প্লাটুন কমান্ডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে (প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে অডিও বক্তব্য রয়েছে) জানিয়েছেন, আমান উল্লাহ এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন দলনেতা-দলনেত্রীর মাধ্যমে এক হাজার টাকা করে নিয়েছেন। এমনকি নিজের হাতেও অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। কোনো সদস্য টাকা না দিলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রামু উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও উপজেলা প্রশিক্ষক (টিআই) আমান উল্লাহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, প্রশিক্ষণবিহীন বা অযোগ্য কাউকে অস্ত্র না দেওয়ার জন্য অস্ত্র বিতরণে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছিলেন। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকায় সব সদস্যকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম ইসলাম জানান, উপজেলা নির্বাচনের মতো একটি রাষ্ট্রীয় কাজে এমন অনিয়ম দুঃখজনক। এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়মের প্রমাণ পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।