খুলনা অফিস
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৪ ২০:৫৩ পিএম
আপডেট : ৩১ মে ২০২৪ ২১:৪৪ পিএম
প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা শনিবার (১ জুন) রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে। শনিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বেনাপোল থেকে ‘বেতনা এক্সপ্রেস’ ট্রেন ছেড়ে মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করবে। ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভার্চুয়ালি এই রেলপথের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন উপলক্ষে ৩০ অক্টোবর ফুলতলা থেকে মোংলা পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চালানো হয়। এ প্রকল্পের স্থায়ী জনবল নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হচ্ছে। এতে গতিশীল হবে মোংলার সঙ্গে যাতায়াত সুবিধা। পাশাপাশি মোংলা বন্দর দিয়ে দ্রুত সময়ে ও কম খরচে মালামাল আমদানি ও রপ্তানি বাড়বে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের অথর্নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সহকারী চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. আব্দুল আওয়াল স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চিঠিতে তিনি বলেন, বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি মোংলা পৌঁছবে দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে। এরপর মোংলা থেকে ট্রেনটি দুপুর ১টায় ছেড়ে বেনাপোলে পৌঁছবে বিকাল সাড়ে ৪টায়। মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন এই রুটে একই সময়ে ট্রেন চলাচল করবে। এই রুটের দূরত্ব ১৩৮ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার। বেনাপোল থেকে ট্রেন ছাড়ার পর নাভারণ, ঝিকরগাছা, যশোর জংশন, রূপদিয়া, সিঙ্গিয়া, চেঙ্গুটিয়া, নওয়াপাড়া, বেজেরডাঙ্গা, ফুলতলা, আড়ংঘাটা, মোহাম্মদনগর, কাটাখালী, চুলকাটি বাজার, ভাগা, দিগরাজ হয়ে মোংলায় যাবে। তবে খুলনা থেকে মোংলা অংশে যাত্রাবিরতি থাকবে ফুলতলা, মোহাম্মদনগর, কাটাখালী ও চুলকাটি বাজার স্টেশনে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, খুলনা থেকে যশোর হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত চলাচল করে বেতনা এক্সপ্রেস নামে একটি লোকাল ট্রেন। সেই ট্রেনটিই মোংলা কমিউটার নাম ধারণ করে বেনাপোল-মোংলা রুটে চলাচল করবে।
খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্প পরিচালকের অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-মোংলা রেলপথ প্রকল্পটি ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি তিনটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেজ-১ আওতায় রেললাইন নির্মাণ, প্যাকেজ-২ রূপসা নদীর ওপর রেলসেতু এবং প্যাকেজ-৩-এর আওতায় টেলিযোগাযোগ ও সিগন্যালিং সিস্টেম রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মূল লাইনসহ রেলওয়ে ট্র্যাকের দৈর্ঘ্য ৮৬.৮৭ কিলোমিটার। তার মধ্যে ৬৪.৭৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ। আর রূপসা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ৫.১৩ কিলোমিটার রেলসেতু। জমি অধিগ্রহণ, রেললাইন, রেলসেতু নির্মাণসহ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২১ সালে আবারও সময় ও ব্যয় দুই-ই বাড়ানো হয়। এ সময় ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। সবশেষ এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয় এবং যা ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ধরা হয়। প্রকল্পের আওতায় আটটি প্ল্যাটফর্ম, ১০৭টি ছোট সেতু এবং ৯টি আন্ডারপাস নির্মাণ শেষ হয়েছে। সেই সঙ্গে সিগন্যালিং, টেলিকমিউনিকেশনসহ আনুষঙ্গিক সকল কাজও শেষ হয়েছে।
খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত রেললাইন ট্রেন চলাচলের জন্য পুরোপুরি উপযোগী হয়েছে। আটটি স্টেশনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে। শনিবার থেকে যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হবে।’
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার অসীম কুমার তালকুদার জানান, বেতনা কমিউটার ট্রেনটি খুলনা থেকে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে বেনাপোল পৌঁছবে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে। একই ট্রেন নাম বদলে ‘মোংলা কমিউটার’ নামে বেনাপোল থেকে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে মোংলা পৌঁছবে ১২টা ৩৫ মিনিটে। এর মধ্যে নতুন এই রুটে যাত্রাবিরতি নাভারণে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে, ঝিকরগাছায় ৯টা ৫০ মিনিটে, যশোরে ১০টা ১১ মিনিটে, সিঙ্গিয়ায় ১০টা ৩০ মিনিটে, নোয়াপাড়ায় ১০টা ৪৬ মিনিটে, ফুলতলায় বেলা ১১টা ৪ মিনিটে, মোহাম্মদগর স্টেশনে ১১টা ৩১ মিনিটে, কাটাখালী স্টেশনে ১১টা ৫০ মিনিটে, চুলকাটি বাজারে দুপুর ১২টা এবং মোংলায় পৌঁছবে ১২টা ৩৫ মিনিটে। ট্রেনটি মোংলা থেকে দুপুর ১টায় ছেড়ে বেনাপোল পৌঁছবে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে। এর মধ্যে চুলকাটি বাজারে দুপুর ১টা ২২ মিনিটে, কাটাখালীতে ১টা ৪০ মিনিটে, খুলনার মোহাম্মদনগরে ১টা ৫৯ মিনিটে, ফুলতলায় ২টা ২৫ মিনিটে যাত্রাবিরতি করে নোয়াপাড়ায় ২টা ৩২ মিনিটে, চেঙ্গুটিয়ায় ২টা ৫২ মিনিটে, সিঙ্গিয়ায় বেলা ৩টা ১১ মিনিটে, যশোরে বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে, ঝিকরগাছায় ৩টা ৫২ মিনিটে, নাভারণে বিকাল ৪টা ১১ মিনিটে এবং বেনাপোলে পৌঁছবে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে।
মোংলা সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালের ১ ডিসেম্বর। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত মোংলা বন্দরের অবস্থান খুলনা শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে পশুর নদ ও মোংলা নদীর সংযোগস্থলে। এই পথে ট্রেন চলাচল শুরু হলে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হবে। গতিশীল হবে মোংলার সঙ্গে যাতায়াত সুবিধা। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা মোংলা বন্দর দিয়ে দ্রুত সময়ে ও কম খরচে মালামাল আমদানি ও রপ্তানি করতে পারবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।