আতিকুল ইসলাম, সিঙ্গাইর (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৪ ১৯:১১ পিএম
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গাইর বাজারে চুল কাটছেন ভ্রাম্যমাণ এক নরসুন্দর। প্রবা ফটো
আধুনিকতার পালাবদলে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে সবখানেই। নতুনের আগমনে দিন দিন বদলে যাচ্ছে মানুষের আচার-আচরণ, এমনকি বিলুপ্ত হচ্ছে পুরোনো দিনের জীবনাচরণ এবং ঐতিহ্য। অনেক কিছুর মতোই এখন আর দেখা যায় না, পিঁড়ি কিংবা টুলে বসে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের সুনিপুণ হাতে চুল ও দাড়ি কাটার দৃশ্য। অনেক পেশার মতোই নরসুন্দরের এই পেশাও বদলে যাচ্ছে।
একটা সময় গ্রামগঞ্জের হাটবাজার এমনকি শহরের অলিগলিতেও টুল, চেয়ার বা পিঁড়িতে বসে বৃদ্ধ, যুবক ও ছোট্ট বাচ্চাদের চুল কাটায় ব্যস্ত সময় পার করত এসব নাপিত বা নরসুন্দররা। একটি কাঠের বাক্সে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, সাবান, ফিটকিরি, পাউডারের পাশাপাশি বসার জন্য থাকত জলচৌকি কিংবা পিঁড়ি। এগুলোয় বসিয়ে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে পিতলের চিরুনি আর কাঁচি দিয়ে কাটতেন চুল। আশি নব্বইয়ের দশকে এভাবে পিঁড়িতে বসিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের চুল-দাড়ি কাটার সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় জীবনের গতিধারায় পরিবর্তন ও নতুনত্বের কারণে এখন সবখানেই গড়ে উঠেছে জেন্টস পার্লার বা সেলুন। যেখানকার বাহারি রঙের চুলের স্টাইলের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে হাটবাজারের ভ্রাম্যমাণ সেলুনগুলো। এসব নরসুন্দরের স্থান দখলে নিয়েছে নামিদামি সেলুন।
সম্প্রতি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গাইর বাজারে গিয়ে চোখে পড়ে বিভিন্ন স্থানে চুল ও দাড়ি কাটার কাজ করছেন ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের কয়েকজন সদস্য। দেখা যায়, কাস্টমারদের পিঁড়ি বা টুলে বসিয়ে চুল ও দাড়ি কাটছেন তারা।
হাটে এসেছেন তালেবপুর ইউনিয়নের কামাল হোসেন। তিনি তার সন্তানকে নিয়ে এসেছেন চুল কাটাতে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে হাটে এসে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের কাছে চুল কাটাতাম। এখন আমি আমার সন্তানদের এনে চুল কাটাচ্ছি। আমি দিনমজুর মানুষ। সেলুনে চুল ও দাড়ি কাটাতে গেলে ১০০ থেকে ১২০ টাকা লাগে। আর এদের কাছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায় এ কাজ করা যায়। সেলুন আর এদের কাজের মান প্রায় সমান।’
এখানে চুল কাটতে এসেছেন মনিরুজ্জমান। তিনি বলেন, আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষই ভ্রাম্যমাণ এই নরসুন্দরদের দিয়ে চুল-দাড়ি কাটান। তাদের কাছে অনেক কম টাকায় চুল-দাড়ি কাটানো যায়।
কথা হয় সিঙ্গাইর বাজারের নরসুন্দর গৌচন্দ্র শ্রীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ৫০ বছর ধরে বাপ-দাদার এ পেশায় আছি। ২০ থেকে ৩০ পয়সা থেকে চুল-দাড়ি কাটার কাজ করেছি। একটা সময় আমাদের কাছে চুল-দাড়ি কাটত মানুষ। এখন আগের চেয়ে লোকজন কম হয়। হাটবাজারের আনাচে-কানাচে সেলুন হয়েছে। সেখানে কাঁচির পরিবর্তে মেশিনে চুল কাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমানে আমাদের কাছে বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের লোকজনই আসেন। আমরা ২০ থেকে ৩০ টাকায় শেভ এবং চুল কাটতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা নিয়ে থাকি। প্রতিদিন সিঙ্গাইর বাজারে খোলা আকাশের নিচে এই কাজ করি। প্রতিদিন যা ইনকাম করি তা দিয়ে কোনোমতে চলছে সংসার। বৃহস্পতি ও রবিবার হাটের দিনে একটু বেশি কাজ হয়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কোনো নির্দিষ্ট দোকান না থাকায় ঝড়বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। আমাদের তো দোকান দেওয়ার মতো সামর্থ্য নাই। দোকান করতে যদি সরকারি সাহায্য পাই তাহলে উপকৃত হতাম।
এই বাজারের আরেক নরসুন্দর সোদিত কুমার শীল বলেন, গ্রামীণ এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছি আমরা। বাজারের ফুটপাথে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি একেকজন জীবনের প্রায় ত্রিশ চল্লিশ বছর। পিঁড়িতে বসিয়ে স্থানীয়দের চুল ও দাড়ি কেটে, শেভ করে যে আয় হয়, সেটা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলে।
ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের কাছে চুল-দাড়ি কাটাতে আসেন বিভিন্ন বয়সের লোকজন। এ কাজের জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বলতে আছে চিরুনি, কাপড়, ছোট আয়না, ক্ষুর, শেভিং ক্রিম, কাঁচি এবং টুল বা পিঁড়ি। বেশ অল্প টাকায় তাদের কাছে চুল-দাড়ি কাটানো যায়। এ কাজের মাধ্যমে প্রতি হাটে একেকজনের আয় হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মতো। কোনো কোনো দিন কারও আয় হয় প্রায় হাজার টাকা। এই পেশায় ৬০ বছর পার করেছেন এমনও আছেন অনেকে। এ সময়ে বাজারের চিত্র বদলে গেলেও বদলায়নি তাদের জীবন। স্বল্প আয়ের এই টাকা দিয়েই চলে তাদের পরিবার।