মনোয়ার হোসেন রুবেল, ধামরাই (ঢাকা)
প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৪ ২২:২০ পিএম
আপডেট : ২৮ মে ২০২৪ ২৩:৫৮ পিএম
ফায়ারফাইটার রাসেলের পরিবারের সদস্যদের আহাজারি। মঙ্গলবার বিকালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সানোড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাসনা এলাকায়। প্রবা ফটো
ছেলে চাকরিতে প্রবেশ করেছে এখনও দুই বছর হয়নি। তার আগেই নিভে গেছে রাসেল হোসেনের মা-বাবার ঘরের প্রদীপ। অথচ কত আশা– ছেলে চাকরি করবে, উপার্জন করবে, পরিবারের হাল ধরবে। মা-বাবা দুজনের বয়স হয়েছে। তাদেরও অবসর প্রয়োজন।
কিন্তু কথায় আছে না– ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। ঠিক যেন তা-ই ঘটল ফায়ারফাইটার রাসেলের পরিবারের সঙ্গে। কারও আশা-ই পূরণ হলো না। তার আগেই সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন রাসেল। সোমবার (২৭ মে) রাতে দায়িত্বরত অবস্থায় বিদ্যুতায়িত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা এলাকায় উপড়ে পড়া গাছ সরাতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হন রাসেল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
রাতেই পরিবারের কাছে পৌঁছে যায় রাসেলের মৃত্যুর খবর। মঙ্গলবার বিকালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সানোড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাসনা এলাকায় তার বাড়িতে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। রাসেলের মা-বাবার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কারও সান্ত্বনাই শান্ত করতে পারছে না মা শেফালি আক্তার ও বাবা আব্দুর রাজ্জাককে।
এ সময় বাড়িতে সাংবাদিক এসেছে শুনে এগিয়ে এলেন রাসেলের মা। সামনে আসতেই তার দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘ছেলেকে গড়ে তোলার জন্য কত কষ্ট করলাম। আমার বাবার বয়স যখন আট বছর তখন থেকে আমি গার্মেন্টসে চাকরি করি। মানুষ বলত– তোমার ছেলে চাকরি করে, এখন তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। আমি আশায় ছিলাম ছেলেটার আয়-রোজগার আরও বাড়ুক। তারপর আমি চাকরি ছাড়ব।’
এসব বলতে বলতে আবার কেঁদে উঠলেন তিনি। এর ফাঁকেই বললেন, ‘সেই ছেলে আমার কাছ থেকে চলে গেল। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব। আমি কীভাবে সহ্য করব। আমার বাবা আমাকে মাটি দিত। এখন আমি আমার বাবাকে কীভাবে মাটি দিব? আমার ঘরের প্রদীপ নিভে গেল।’

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুর রাজ্জাক ও শেফালি আক্তার দম্পতির এক মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ছোট রাসেল হোসেন। ২০২১ সালে এসএসসি পাস করে এইচএসসিতে ভর্তি হন ধামরাইয়ের ভালুম আতাউর রহমান খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে পড়া অবস্থায় ২০২৩ সালে ফায়ার সার্ভিসে ফায়ারফাইটার পদে চাকরি হয় তার। কর্মস্থল ছিল খাগড়াছড়িতে।
সবশেষ শুক্রবার ভিডিও কলে ছেলের সঙ্গে কথা হয় জানিয়ে শেফালি আক্তার বলেন, ‘রোজার ঈদে রাসেল ছুটি পায়নি। ঈদের পর বাড়িতে আসছিল। তখন একটা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলাম। ২০ তারিখ ছেলের ছুটি ছিল। আমি বলছি কোরবানির (ঈদুল আজহা) ঈদে ছুটি নেওয়ার জন্য। একসঙ্গে বাড়িতে ঈদ করব। আমার ছেলেও ঈদে বাড়িতে আসার জন্য ছুটি নেয়নি। পাঞ্জাবি পরে তার বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে যাবে বলেছিল।’
বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার দিন কীভাবে যাবে। আবার বাবা আমাকে রেখে কীভাবে হারিয়ে গেল। এত কষ্ট করে ছেলেকে বড় করেছি। বুকের মধ্যে রেখে বড় করেছি। কখনও ছেলেকে আঘাত করিনি। আমার ঘরের প্রদীপ শেষ হয়ে গেল।’
তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার কাছে চেয়েছিলাম ছেলেটা অন্তত আমাকে মাটি দেওয়ার জন্য হলেও যেন বেঁচে থাকে। আমার সেই ভাগ্য হলো না।’