সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৪ ০৯:২০ এএম
আপডেট : ২৮ মে ২০২৪ ১২:২৩ পিএম
ভারী বর্ষণে কোমড় পানিতে তলিয়ে যায় নগরীর বিভিন্ন এলাকা। সোমবার দুপুরে মুরাদপুর এলাকা থেকে তোলা। প্রবা ফটো
শহরের জলাবদ্ধ নিরসন প্রকল্পের কাজ ছয় বছরেও শেষ করতে পারেনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে দুই বছরের মতো সময় থাকায় নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ হবে বলে আশা রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল শুরু হওয়া কাজের ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলেও তাদের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্প নেয় সিডিএ। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে সিডিএ। একই বছরের ২৮ এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড কাজ শুরু করে।
কাজের অগ্রগতি কতদূর– এ প্রসঙ্গে সিডিএর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে খালের বিভিন্ন স্থানে রিটেইনিং ওয়াল, রেগুলেটর স্থাপনের কাজ চলছে। যেহেতু কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিস্তারিত তারা বলতে পারবে।
সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩৬টি খালের ২১টি খনন ও সংস্কার করা হয়েছে। ছয়টির মধ্যে পাঁচটির মুখে পাম্পসহ রেগুলেটর চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন খালের পাশে ১২১ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা করছেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে। কাজ শেষে নগরবাসী সুফল পাবে।
গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হয়েছে নগরীতে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে এই সময়ে নগরীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৩২ মিলিমিটার। এতে বিভিন্ন এলাকা ও মূল সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা যায়।
নগরবাসী বলছেন, প্রকল্পের কাজ অনেকখানি শেষ হলেও ভারী বৃষ্টির মধ্যে ভোগান্তি খুব বেশি লাঘব হয়নি। ভারী বৃষ্টিপাতে আগের মতো নগরী জলাবদ্ধ না হলেও কিছু এলাকার পানি সরতে দুই-আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
চকবাজার এলাকায় মোহাম্মদ হাসান নামে এক পথচারী বলেন, স্থায়ী চিন্তা করতে হবে, না হলে এই জলাবদ্ধতার দুঃখ ঘুচবে না।
বিপ্লব পার্থ নামে আরেক পথচারী বলেন, সকাল ১০টার দিকে ২ নম্বর গেট হয়ে প্রবর্তক মোড়ে যাওয়ার সময় মূল সড়কে হাঁটুপানি ছিল। তখন ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। ২ ঘণ্টা পর দুপুর ১২টার দিকে ওই সড়ক দিয়ে ফেরার সময় দেখি পানি সরে গেছে।
ভারী বৃষ্টিপাতে কিছু এলাকা দুই-আড়াই ঘণ্টার মতো জলাবদ্ধ থাকে বলে স্বীকার করেছেন সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা একেবারে কমেনি, এটা ভুল। আগে জলাবদ্ধতা অন্তত সাত-আট ঘণ্টা স্থায়ী হতো। এখন সর্বোচ্চ আড়াই ঘণ্টা থাকে। খাল-নালা পরিষ্কার থাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে। অতি বৃষ্টি হলে তা ভিন্ন কথা। কিছু এলাকার পানি দেরিতে নামছে।
কিছু এলাকায় পানি সরতে দেরি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ধরুন চকবাজার এলাকায় পানি জমে আছে। এর কারণ চকবাজার ফুলতলা ব্রিজের নির্মাণকাজ চলছে। এতে পানিপ্রবাহে কিছুটা বিঘ্ন হচ্ছে। ফলে আশপাশের এলাকারও পানি যথাযথভাবে খাল দিয়ে সরতে সমস্যা হয়। তাছাড়া ২৭টি সিলট্র্যাপ (বালুর ফাঁদ) নির্মাণের কথা ছিল। এগুলোর ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে বাকি সিলট্র্যাপগুলো করা যাচ্ছে না। হিজরা খালের সংস্কার ও খননকাজও করা সম্ভব হচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণ জটিলতা কেটে গেলে প্রকল্পের কাজের গতি বাড়বে।
প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে নগরবাসী সুফল পাবে জানিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ৫৭টি খালে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ময়লা ফেলছে নগরবাসী। এসব ময়লা বিভিন্ন খালে পানিপ্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে না পারলে জলাবদ্ধতা নিরসন দুরূহ। এজন্য নগরবাসীকে নিজের অবস্থান থেকে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
রেমালের তাণ্ডব শেষে নগরীর স্বাভাবিক কার্যক্রম
এদিকে ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডব থামার পর নগরীর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আগের মতো চালু হয়েছে। গতকাল দুপুরের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করেছে সমুদ্রপথে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। ১৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর একই সময়ে যান চলাচলের জন্য পুনরায় চালু করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। এর আগে ১৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ভোর ৫টা থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুরু হয় বিমান ওঠানামা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৯ নম্বর মহাবিপদসংকেত দেখাতে বলার পর রবিবার সকাল ১০টায় জেটিতে থাকা ১৯টি জাহাজ বহির্নোঙরে গভীর সমুদ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে নিজস্ব অ্যালার্ট-৪ জারি করে যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অধিদপ্তর বিপদসংকতে নামিয়ে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করার পর বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। পণ্য ডেলিভারি শুরু হয়েছে। জেটি থেকে বহির্নোঙরে পাঠানো জাহাজগুলো পুনরায় জেটিতে ভেড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু চলছে।
বঙ্গবন্ধু টানেল কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী (ইএমই) গোলাম সামদানী হিমেল বলেন, সেতু কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে টানেলে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। প্রথমে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সময়ের পরও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব থাকায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত টানেল বন্ধ রাখা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কমে দুপুর ১২টায় যান চলাচলের জন্য টানেল পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন যান চলাচল স্বাভাবিক। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে টানেলে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন তাসলীম আহমেদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে অপারেশন কার্যক্রম ১৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুনরায় ফ্লাইট ওঠানামা চালু হয়েছে। সোমবার ভোর ৫টা থেকে পুনরায় যাত্রীসেবাসহ রানওয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। অপারেশন বন্ধ থাকার কারণে ১৭ ঘণ্টায় পাঁচটি আন্তর্জাতিক ও ১২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট শাহ আমানতে অবতরণ করতে পারেনি। ফ্লাইটগুলো রিশিডিউল করা হয়েছে।