প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৪ ২০:০১ পিএম
আপডেট : ২২ মে ২০২৪ ২০:২৬ পিএম
সুন্দরবনে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মানবসৃষ্ট ও পরিকল্পিত বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। বুধবার (২২ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘বারংবার আগুন-সন্ত্রাসের কবলে সুন্দরবন : কারণ ও প্রতিকার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ দাবি করেন। তারা বলেন, মানবসৃষ্ট ও পরিকল্পিত আগুনে সুন্দরবনের গাছপালা, পশু-পাখি ও কীটপতঙ্গ পুড়ছে। এতে সামগ্রিকভাবে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। প্রাণিকূলের আবাসস্থল ও প্রজননস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে প্রাণিকূলের খাদ্যচক্রে।
বাপার পক্ষ থেকে উত্থাপিত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন বিভাগ ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মৎস্য সিন্ডিকেট এই অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে। বারবার একইভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটালেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলার কারণে দোষীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
বাপার সহসভাপতি মহিদুল হক খানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। বনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সরেজমিনে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক নূর আলম শেখ। আরও বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাদের, বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার প্রমুখ।
ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘গত ২২ বছরে সংরক্ষিত এই ম্যানগ্রোভ বনে ৩২ বার আগুন লেগে শতাধিক একর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়েছে। কঠোর মনিটরিংয়ের অভাবে সুন্দরবনে একের পর এক আগুন লাগছে। সর্বশেষ ৪ মে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া টহল ফাঁড়ির লতিফের ছিলা এলাকায় আগুন লাগে। বন বিভাগের হিসেবেই পুড়ে যায় ৭ দশমিক ৯ একর বনভূমি। দেশের কিছু কুচক্রী মহলের অতিলোভের কারণে সুন্দরবন বিভিন্নভাবে ধ্বংস হচ্ছে। আর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে বনজীবীদের ওপর। সুন্দরবনে প্রাণিকূলের আবাস ও প্রজননস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্য প্রাণীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বনের প্রাণ-প্রকৃতির শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রভাব পড়ে বনের প্রাণিকূলের খাদ্যচক্রে। এতে চরম আঘাত আসে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ওপরে।’
সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কোনোভাবেই বন বিভাগ দায় এড়াতে পারে না বলে মনে করেন নূর আলম শেখ। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনে আগুনের ঘটনা প্রাকৃতিক নাকি মানবসৃষ্ট? সুন্দরবনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কোনোভাবেই বন বিভাগ দায় এড়াতে পারে না। যাদের নিকট সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের কাছে কি সুন্দরবন আদৌ নিরাপদ?’
তিনি আরও বলেন, ‘সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল হলেও আমুরবুনিয়া টহল ফাঁড়ি অঞ্চলে চোরা শিকারিসহ মানুষের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। মুনাফালোভী মাছ ব্যবসায়ী ও অসৎ বনকর্মর্তাদের যোগসাজশে বারে বারে সুন্দরবনে আগুন লাগানো হচ্ছে। সুতরাং এর দায়ভার বন বিভাগকেই নিতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী-পরিবেশকর্মী-সংবাদকর্মী- গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা, সুন্দরবনে অপরিকল্পিত খাল খনন এবং অতীতে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার কারণেই সুন্দরবনের আমুরবুনিয়া এলাকায় আবারও এই অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হলো।’
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাদের বলেন, ‘সুন্দরবনে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্পকারখানা করা যাবে না। অথচ সুন্দরবনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গায় রামপাল তাপবিদুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে; যা সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সুন্দরবনে ঘন জঙ্গলের পরিমাণ মাত্র ১৩ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে। বন রক্ষায় স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করতে হবে।’
বাপার পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে রামপালবিষয়ক ১৩টি গবেষণাপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল জানিয়ে আলমগীর কবির বলেন, ‘পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এসব সুলিখিত গবেষণা প্রতিবেদন জমা দিয়ে প্রয়োজনমতো উন্মুক্ত আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছিলাম, কিন্তু এ বিষয়ে সাত বছরেও সরকার পক্ষ থেকে কোনো মতামত দেয়নি।’
অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘আমরা সুন্দরবন রক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ। অনিয়ন্ত্রিত জলযান ও পর্যটকদের অবাধে বিচরণের ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে।’
দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সমন্বয় না হলে দেশের বন-পরিবেশ কোনোটাই নিরাপদ না বলে মনে করেন মহিদুল হক খান। বলেন, ‘তাই দুটির মধ্যে সমন্বয় একান্ত জরুরি। সুন্দরবনের ওপর যে অত্যাচার চলছে, তা খুবই দুঃখজনক। সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এটা কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্ববাসীর সম্পদ, এর ক্ষতি করার কোনো অধিকারই আমাদের নেই। বরং একে রক্ষা করা জাতীয় কর্তব্য।’
সুন্দরবন রক্ষা করতে ঐকমত্যে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার স্বার্থে পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প বাতিল করে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সুন্দরবনের অগ্নিকাণ্ড বন্ধে ১৬টি সুপারিশ তুলে ধরেন ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে— অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে ও অগ্নিকাণ্ড বন্ধে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, নৌ-পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, সংবাদকর্মী, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে; অগ্নিকাণ্ডে বিগত দিনের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে; সুন্দরবনের লোকালয়সংলগ্ন এলাকায় ওয়াচটাওয়ার নির্মাণ করতে হবে; বনের মধ্যে অবাধ যাতায়াত বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি।