প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২২ ১৫:৫২ পিএম
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২২ ১৬:১১ পিএম
জঙ্গিবাদ থেকে ছেলেকে আত্মসমর্পণের অনুরোধ মায়ের। ছবি : প্রবা
আব্বু, যদি তুমি আমার ম্যাসেজ পেয়ে থাকো, বলতে চাই, তুমি চরম একটা ভুল পথে আছো। তুমি তোমার এই মাকে বিশ্বাস করতে পারো। তোমার কাছে আমার অনুরোধ, তুমি যদি কখনো তোমার এই মাকে ভালবেসে থাকো, তাহলে তুমি দেশের জন্য কোনো ধরনের হুমকির কাজ করবে না। কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা, নৃসংতা, অন্যায় কাজে সামিল হবে না। আমি অনুরোধ করছি, তুমি আত্মসমর্পণ করো। প্রশাসন সদয় হবে।
বুধবার (৯ নভেম্বর) দুপুরে কাওরান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের মাধ্যমে সন্তানের কাছে এই আর্জি জানান আম্বিয়া সুলতানা এমিলি নামে এক মা।
এমিলি বলেন, তার ছেলে আবু বক্কর রিয়াসাদ রাইয়ান (১৫) জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিরুদ্দেশ রয়েছে। তিনি নিজেই ছেলেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি তার ভুল বুঝতে পারছেন।
নিরুদ্দেশ তরুণদের বিষয়ে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা নজরদারি করতে গিয়ে তথ্য পায়, গত মার্চে নারায়ণগঞ্জ থেকে নিরুদ্দেশ হয় রাইয়ান। তার পরিবার থানায় জিডি করে। ইতোপূর্বে র্যাব প্রকাশিত নিরুদ্দেশ ৫৫ জনের তালিকায় রায়হানের নাম রয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর অভিযানে র্যাব জানতে পারে, এমিলি নিজে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং ছেলে রাইয়ানকেও উদ্বুদ্ধ প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়েছেন। এই পাঠানোকে হিজরত বলছেন নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সদস্যরা।
গত ৫ নভেম্বর র্যাব সদস্যরা এমিলিকে হেফাজতে নেন। পরে তারা তাকে পরিবারের সান্নিধ্যে রেখে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালান।
প্রক্রিয়া শেষে এমিলিকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়।
এমিলি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মাস্টার্স কমপ্লিট করা মেয়ে। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে চাকরি করেছি। ২০১৩ সালে বিমান বাংলাদেশে চাকরি করেছি খণ্ডকালীন। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, চরম ভুল একটা পথকে সঠিক মনে করে সন্তানকে দিয়েছিলাম। এ কারণে আজকে আমার আদরের সন্তান বান্দরবানের পাহাড়ে অর্ধমৃত অবস্থায় আছে। আমি জানি না আমার সন্তান বেঁচে আছে কিনা। জানি না আমি কখনো দেখতে পাবো কিনা। এটা আমার মা হিসেবে চরম ব্যর্থতা। শিক্ষিত মেয়ে হয়েও আমি বুঝতে পারিনি। আমার কোরআন-হাদিসের দক্ষতা কম ছিল। আমি বুঝতে পারিনি ঠিক কোনটা আর ভুল কোনটা। আমাকে ডিমটিভেটেড করা হয়েছে। আমার সন্তান আবু বক্কর রিয়াসাদ রাইয়ানকেও (১৫) করা হয়েছে। আমাকে মিসগাইড করা হয়েছে।
‘জঙ্গিদের গ্রুপ, সংগঠনের নাম, তাদের কর্মকাণ্ড—সবকিছু আমার কাছে গোপন করা হয়েছিল। একটা ভুল বিষয়কে আমার সামনে কোরআন-হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে বোঝানো হয়েছে সঠিক হিসেবে।’
এমিলি বলেন, ‘রাইয়ান আমার একমাত্র আদরের সন্তান। অন্যান্য মায়ের মতোই। ও আমার কলিজার টুকরা। মেধাবী ছাত্র। বিনয়ী ছিল। দুষ্ট বাচ্চার জন্য মায়ের একটু কষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু আমার রাইয়ান ছিল বিনয়ী, ভদ্র ও খুবই অবিডিয়েন্ট। বিপথে নেওয়ার জন্য এই রকম ছেলেদের টার্গেট করা হচ্ছে।’
র্যাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গত ৫ নভেম্বর র্যাবের যারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তারা খুবই সাবলীলভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বুঝিয়েছেন। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, তারা আমাকে বোঝার সুযোগ দিয়েছেন। জঙ্গিদের উদ্দেশ্য কী, দেশের জন্য তারা কতোটা ভয়ঙ্কর, দেশে যে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, এসব এখন আমার কাছে পরিষ্কার। একজন মা কখনো চায় না তার আদরের সন্তান বিপথে চলে যাক। সন্তান যতোই খারাপ হোক না কেন। মা কখনো তা চায় না। কিন্তু সন্তানসহ আমি ডি-মটিভেড হয়ে গিয়েছিলাম।
‘আমার সন্তান চলতি বছর ১৫ মার্চ ঘর থেকে বেরিয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে তার শিক্ষক আল আমিন দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরে যোগাযোগ করেন। আল আমিন আমাদের খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন। ভদ্র, বিনয়ী আল আমিন খুব ভাল পড়াতেন বলে আমরা তাকে খুবই পছন্দ করতাম। সে-ই আমাদের ডি-মটিভেট করেছেন। তিনিই আমাদের কোরআন-হাদিসের রেফান্সে দিয়ে গাজওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে ভুল বোঝান। আল আমিন বলেছিলেন যে, প্রস্তুতি নিতে হবে, গাজওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে তৈরি হয়ে থাকতে হবে।’
গাজওয়াতুল হিন্দ বা ‘গাজোয়া-এ হিন্দ’ অর্থাৎ হিন্দুস্তান বিজয়ের জিহাদ। গাজওয়াতুল হিন্দের বাংলা শাখা ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ বলে প্রচার থাকলে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব রয়েছে।
এমিলি বলেন, ‘আমি প্রথমে সন্তানকে বলতাম, তোমার এসব শুনতে হবে না, তুমি পড়াশুনা করো। রাইয়ান সায়েন্সের ছাত্র ছিল। সে ছোট বেলা থেকেই বৃত্তি পাওয়া ছাত্র। শিশু একাডেমি থেকে সে পুরস্কার পেয়েছে। আল আমিন খুবই অল্প সময় কথা বলে আমার সন্তানকে আয়ত্তে নিয়েছেন। আমিও ভুল বুঝে মেনে নিয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, আমার সন্তানকে প্রশিক্ষণে নিয়ে যাওয়া হবে, ভাল প্রশিক্ষণ, সে সবকিছু জানবে। সে দেখা করতে পারবে, সে যোগাযোগ করতে পারবে। সে বাসায় আসতে পারবে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাকে ভুল বোঝানো হয়েছে।
‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমি যে ভুল করেছি, আমার বুকটা যেভাবে খালি হয়েছে, সেই একই ভুল যেন কোনো বাবা-মা না করেন। আমি শিক্ষিত মেয়ে। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমার খাওয়া-ঘুম সব হারাম হয়ে গেছে। আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমে বলতে চাই, আব্বু, যদি তুমি আমার ম্যাসেজ পেয়ে থাকো, তুমি চরম একটা ভুল পথে আছো। তুমি তোমার এই মাকে বিশ্বাস করতে পারো। তোমার কাছে আমার অনুরোধ, তুমি যদি কখনো তোমার এই মাকে ভালবেসে থাকো, তাহলে তুমি দেশের জন্য কোনো ধরনের হুমকির কাজ করবে না, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নৃসংতা, অন্যায় কাজে সামিল হবে না। আমি অনুরোধ করছি, তুমি আত্মসমর্পণ করো। প্রশাসন সদয় হবেন।’
ছেলের উদ্দেশে তার বাবা খবর বলতে গিয়ে এমিলি বলেন, ‘তোমার বাবা অনেক অসুস্থ হয়ে গেছে। আমি খুব ভয় পেয়ে গেছি, যদি তার কিছু হয়ে যায়। তোমার নানা-নানি সবার অবস্থা খারাপ। তোমার কাক্কু, আত্মীয়-স্বজন—সবাই পাগলপ্রায়। তোমার বাবার জন্য চরম ব্যর্থতা হবে যদি তুমি বিশৃঙ্খলা করো, নৃসংস কিছু করো। তুমি তোমার বাবা-মাকে অপমানিত করো না। এই দেশে জন্ম নিয়ে তুমি অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছো।’
মা হিসেবে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে এমিলি বলেন, ‘আমি শিক্ষিত মা হিসেবে অনুরোধ করছি, বাবা-মা হিসেবে সন্তানকে সময় দেবেন, সময় দেবেন, বুকে জড়িয়ে ধরবেন, ভেতরটা জানার চেষ্টা করবেন। ভালবাসবেন। প্রতিদিন জানবেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবহেলা করবেন না। সে ছিটকে যেতে পারে যেকোনো সময়। তখন আমার মতো বুক ভাসিয়ে আর কোনো লাভ হবে না। সন্তানের মনটা বুঝুন। মা-বাবা যখন সত্যিকারের বন্ধু হতে পারে তখন সবকিছু শেয়ার করে, কাছে যেতে পারে। সন্তান হিসেবে অসহায় বোধ করবে না। বিপথে চলে যাবে না। সকল বাবা-মাকে বলছি, সংশোধন হোন, নইলে নিজেও ধ্বংস হয়ে যাবেন, জাতিও ধ্বংস হয়ে যাবে।’
তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্র্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ করেন নিরুদ্ধে ছেলেদের ফিরিয়ে আনতে।
এমিলি বলেন, ‘ওদের সুযোগ দিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার, মায়ের বুকে ফিরে আসার। ওদের উদ্ধার করুন।’