× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হরিদাসের ভয়ঙ্কর প্রতারণার গল্প

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২২ ১৫:৪৭ পিএম

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২২ ১৬:৪৫ পিএম

গ্রেপ্তার দুই প্রতারক। ছবি: প্রবা

গ্রেপ্তার দুই প্রতারক। ছবি: প্রবা

‘হরিদাস পাল’ বাংলায় প্রচলিত একটি প্রবাদ। অযোগ্য ও তুচ্ছ ব্যক্তিকে অবহেলার্থে বলা হয়ে থাকে ‘তুমি কোন হরিদাস পাল হে’? কিন্তু হরিদাস পাল কথার কথা নয়, তিনি বাস্তব চরিত্র।

১৮৭৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের রিষড়ার এক অতি দরিদ্র গন্ধবণিক পরিবারে হরিদাস পালের জন্ম। পিতা নিতাইচরণ পালের মৃত্যুর পর হরিদাস ১৮৯২ সালে কলকাতায় আসেন। সেখানে স্বর্ণের দোকানে সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ নেন।

১৮৯৭ সালে হরিদাসের কলকাতা নিবাসী একমাত্র ধনী নিঃসন্তান মামা মারা যাওয়ায়, রাতারাতি হরিদাস উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে যান। তিনি বড়বাজারে কাচ ও লণ্ঠনের ব্যবসা শুরু করেন। পরিশ্রমী, সৎ ও বুদ্ধিমান হরিদাস কয়েক বছরের মধ্যে তার ব্যবসা অনেক বাড়িয়ে তোলেন। বিপুল অর্থ তাকে কলকাতার বাবু সমাজে স্থান করে দেয়। তার দান-ধ্যান ও পরোপকারের জন্য জনসাধারণ তাকে ভালোবাসতো। দাতা হরিদাসের উদার মনোভাব আর সহানুভূতিশীল ব্যবহারে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।

সোয়া শ’ বছর পর রাজধানী ঢাকায় আরেক হরিদাসের খবর দিয়েছে পুলিশের এলিট ফোর্স র‍্যাব। এ হরিদাস রাতারাতি উত্তরাধিকার  সূত্রে কিছুই পাননি। তবে প্রতারণার মাধ্যমে ৮ বছরের মধ্যে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যের প্রটোকল অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে এ প্রতারণার জাল বুনেন তিনি।

২০১০ সালেও রাজধানীর উত্তরায় পুরাতন এসি মেকানিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ওরফে তাওহীদ। তার বয়স ৩৪ বছর। ২০১৮ সালে একজন সবজি বিক্রেতা ছিলেন। ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে হরিদাস চন্দ্র থেকে তাওহীদ ইসলাম হয়ে যান। এরপর এ হরিদাসের শুরু প্রতারণা আর কোটি কোটি টাকা আত্মসাতে ধনী ও প্রভাবশালী বনে যাওয়ার গল্প।

প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া টাকায় উচ্চাভিলাষী হরিদাসকে থামিয়েছে র‍্যাব। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ভুয়া প্রটোকল অফিসারের পরিচয়ে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা চক্রের হোতা হরিদাস চন্দ্রকে সহযোগীসহ জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সহযোগীতায় রাজধানীর বনানী থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৩ এর একটি দল।

মঙ্গলবার (৮ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক খন্দকাল আল মঈন বলেন, ‘এক শ্রেণির প্রতারকচক্র স্পর্শকাতর ব্যক্তিদের অথবা সমাজের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে বা তাদের প্রটোকল অফিসার,বিভিন্ন মন্ত্রীর ভুয়া এপিএস পদবী ব্যবহার করে মানুষের সাথে প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাৎ করছে। এমনকি প্রতারক চক্র প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ভুয়া প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়েও বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে।’

এমন তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতারক চক্রের প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে এনএসআই ও র‍্যাব-৩ এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর বনানী এলাকা হতে শ্রী হরিদাস চন্দ্র ওরফে তাওহীদ ও সহযোগী ইমরান মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

হরিদাস বগুড়া শিবগঞ্জের উথলী বাজারের শ্রী গোপীনাথের ছেলে। আর ময়মনসিংহের ত্রিশালের নওদারের সাইফুল ইসলামের ছেলে প্রতারণার সহযোগী ইমরান মেহেদী হাসান।

খন্দকার মঈন বলেন, ‘হরিদাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অবৈধ উপায়ে ভারতে আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। সেখানকার পঞ্চায়েত প্রধানের নিকট থেকে এতিম সার্টিফিকেট নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন ও ইলেক্ট্রনিক বিষয়ে দুই বছরের বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।’

২০১০ সালে দেশে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় পুরাতন এসি মেকানিকের কাজ শুরু করেন। ২০১৮ সালে সবজি বিক্রেতার সঙ্গে সাবলেট বাসা ভাড়া নেন। সেখানেই বিয়ে ও ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে তাওহীদ ইসলাম ধারণ করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে হরিদাস র‍্যাবকে জানান, তার শ্বশুরের পরিচয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় কিছু জমি ক্রয় করেন। শ্বশুরের মাধ্যমে এলাকার লোকের সাথে নিজেকে একজন বিত্তশালী লোক হিসেবে পরিচিত হন। পাশাপাশি প্রচার করতে থাকেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে এবং পোশাক পরিধান করে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, গণ্যমান্য বিত্তশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় ও সখ্য গড়ে তোলেন। প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়ের সহায়তায় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রজেক্টে বিনিয়োগে প্রলোভন দেখান।

এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে অর্থ এবং উন্নয়নমূলক কাজ করতে তাদেরকে আশ্বস্ত করতেন। তার প্রতারণায় প্রলুব্ধ হয়ে অনেকেই চাকরি, বদলি, টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির নিয়ে তার কাছে আসা শুরু করেন। সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সে চাকরিপ্রত্যাশী, পছন্দমত জায়গায় বদলি, সরকারি চাকরি, বিভিন্ন ক্রয়-বিক্রয় ও উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ শুরু করেন।

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তার ইমরান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত তার বিভিন্ন সহযোগীসহ অন্যান্য ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করে হরিদাসের নিকট নিয়ে আসতেন। এ সময় হরিদাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিভিন্ন পদে চাকরি, পদোন্নতি এবং দলীর বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ করেন।

কমান্ডার মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তার হরিদাস অত্যন্ত বচনপটু। একবার তার সাথে কেউ পরিচিত হলে তার প্রতারণার খপ্পর হতে বের হতে পারে না। তিনি প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ২০১৯ সালে ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি ক্রয় করে প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক নামে রিসোর্টের কাজ শুরু করেন। সেখানে তার প্রলোভনে পড়ে অনেকেই টাকা লেনদেনের রসিদ ছাড়া তাকে লাখ লাখ টাকা লগ্নি করেন।

‘২০২০ সাল প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে রিসোর্টের কাজ শেষে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা, সুইমিংপুলে গোসল ১০০ টাকা এবং রিসোর্টের ভিতরে ঘোরাঘুরির জন্য ৫০ টাকা করে টিকেট বিক্রি করা শুরু করেন। অনেকে বিবাহ, জন্মদিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য তার রিসোর্ট ভাড়া নিতে থাকে। হরিদাস বিভিন্ন বিত্তশালী ব্যক্তিদের তার রিসোর্টে আমন্ত্রণ জানায় এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার এডিট করা ছবি প্রদর্শন করে তার প্রজেক্টসহ অন্যান্য প্রজেক্টে বিনিয়োগ করার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেন।’

প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে র‍্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তার মোবাইলে বিভিন্ন নম্বর প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের এবং নিকটাত্মীয়ের বিভিন্ন সদস্যদের নামে সেইভ করে ও কল দিয়ে দেখাতেন। নিজেকে প্রভাবশালী বলে জাহির করতেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তার কোন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর সাথে পরিচয় নেই। তার কোন দলীয় পরিচয় নেই। প্রতারণা করে অর্থ উপার্জনই তার মূল লক্ষ এবং পেশা।’

একাধিক ব্যাংকে নামে-বেনামে তার বিভিন্ন একাউন্ট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একাউন্টগুলোতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি ফুলবাড়িয়া এবং বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে শতাধিক লোকের নিকট হতে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার কাজে বাধা দেওয়ায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেন। স্বর্ণ চোরাচালান ও স্বর্ণের বারের অবৈধ বানিজ্যেও তিনি জড়িত বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।’

র‍্যাবের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার ইমরান মেহেদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার। তার নামে প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি প্রদান, অনলাইনে নিবন্ধন আবেদন, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের নবায়নসহ অর্থ জালিয়াতির বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকায় শাস্তিস্বরূপ ২০২২ সালের প্রথম দিকে বিভাগীয় শহর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়।

ইমরান হরিদাসের মাধ্যমে নিজের বদলি আদেশ বাতিলের চেষ্টা করেন। এই দুই প্রতারক মিলে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের একজন সদস্যের নাম লিখে ভুয়া সিল দিয়ে একটি ভুয়া ডিও লেটার তৈরি করেন। এরপর এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে দ্রুত বদলির আদেশ বাতিল করে পূর্বের পদে বহালের জন্য সুপারিশ করেন। তবে ডিও লেটারটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এনএসআইয়ের নিকট অভিযোগ করলে চক্রের প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা