× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বেইলি রোডে আগুনের সময় অপচয় ২০ মিনিট

বাঁচত হয়তো অনেকেই

সাইফ বাবলু

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৪ ১০:২৬ এএম

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৪ ১০:২৭ এএম

বেইলি রোডের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ফাইলি ফটো

বেইলি রোডের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ফাইলি ফটো

বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে আগুন লাগার খবর ২০ মিনিট পর পায় ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থলে পৌঁছতে সময় লেগেছে মাত্র ৬ মিনিট। আগুন লাগার ২৬ মিনিটের মাথায় ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভেতরে আটক শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুধু গ্রিন কোজি কটেজের সামনের অংশ দিয়ে ছাদে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার শুরু করে। কিন্তু ভবনটির পেছনের অংশ দিয়েও উদ্ধারের সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটি করা হয়নি। উদ্ধার কার্যক্রমে নষ্ট হয়েছে অনেক সময়। ২০ মিনিট দেরিতে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া, উদ্ধার কার্যক্রমে সময় নষ্ট, নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতায় ভয়াবহ এ আগুনে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এলাকাবাসী, প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা মিলেছে।

এ ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, চা চুমুক রেস্টুরেন্টে রান্নার জন্য জ্বালানো চুলায় একটি সিলিন্ডার থেকে সংযোগ পাইপ খুলে আরেকটি সিলিন্ডারে লাগানোর সময় আগুন ধরে, যা ছড়িয়ে পড়ে ভবনজুড়ে। মামলাটি রমনা থানা থেকে তদন্তের জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্ত করে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শী দুজন পুলিশ সদস্যের ভাষ্যমতে, ৯টার পর গ্রিন কোজি কটেজের চা চুমুকে আগুন লাগার দৃশ্য দেখতে পেয়ে ছুটে যান সেখানে। তখন আগুনের অবস্থান শুধু দোকানটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ওই সময় ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়াও ভবনের নিচতলায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি আগুন নেভানোর চেষ্টায় এগিয়ে আসেন। অনেকে সামনে দাঁড়িয়ে ভিড় করেন। কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিলেন। কয়েকজন মিলে ৮ থেকে ১০টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার এবং ফায়ার বলসহ নানাকিছু দিয়ে নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সময় চা চুমুকের সামনে একটি সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটলে মুহূর্তেই নিচতলার দোকানের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে আগুন।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল বলেন, আগুন লাগার পর যখন বিস্ফোরণ হয় তখন ফলস সিলিংগুলোয় আগুন ধরে যায়। সামনে অনেক বিলবোর্ড ছিল, সেগুলোতে দ্রুতই আগুন লেগে ওপরের দিকে ছড়াতে থাকে। আধা ঘণ্টা আগুন জ্বলার পর পানি দেওয়া শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। ওই সময় ব্যাপক ধোঁয়ারও সৃষ্টি হয়।

২০ মিনিট পর কেন ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলো?

আগুন লাগার ২০ মিনিট পর কেন ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলো, এ তথ্যের কোনো পরিষ্কার উত্তর মিলছে না। ফায়ার সার্ভিস বলছে, অনেক সময় আগুনের ঘটনায় ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। প্রথমে নিজেরা চেষ্টা করেন, ব্যর্থ হয়ে পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। কিন্তু যেকোনো আগুনের ঘটনায় বিশেষ করে গ্যাস বা বৈদ্যুতিক আগুনের ক্ষেত্রে এমনটা করা ভুল। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন বলছেন, প্রথমে আগুন ছোট মনে করা হয়েছিল। নিজেরাই নিভিয়ে ফেলতে পারবেন এমনটা মনে করেছেন চা চুমুকের কর্মচারীরাও। ফায়ার এক্সটিংগুইশার ও ফায়ার বল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। তখন রীতিমতো ২০ মিনিট পার হয়ে গেছে আগুনের। ইতোমধ্যে আগুন ভবনের নিচ থেকে তৃতীয় তলায় পৌঁছে যায়।

ফায়ার সার্ভিসের মুখপাত্র সিনিয়র স্টাফ অফিসার শাহজাহান শিকদার জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিস আগুনের খবর পায় ৯টা ৫০ মিনিটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আসতে সময় লেগেছে মাত্র ৬ মিনিট। বড় আগুন দেখার পর কন্ট্রোল রুমে সাহায্য চাওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে ১৩টি ইউনিট আগুন নির্বাপণে কাজ শুরু করে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট টার্ন টেবিল লোডার (ক্রেন জাতীয় সিঁড়ি) স্থাপন করতে ১০ থেকে ১২ মিনিট লেগেছে। লোডার সাততলার ছাদ পর্যন্ত গেলেও সামনে যেতে পারছিল না। দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ছাদে আটকে থাকা লোকদের উদ্ধার করে। 

পেছন দিয়ে উদ্ধারের সুযোগ ছিল আটকে পড়া নারী, পুরুষ ও শিশুদের

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনের পেছনে রেস্টুরেন্টগুলোর রান্নাঘর। দোতলায় কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের যে বড় গ্রিল ছিল সেখানে একটি বড় অংশ ফাঁকা। দোতলার মানুষদের সেখান দিয়ে বের করার সুযোগ ছিল। কিন্তু পেছন দিয়ে বের না করে ওপরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যাদের অধিকাংশ তিনতলায় গিয়ে আটকে পড়ে। 

স্থানীয়রা জানান, পেছন দিক থেকে কয়েকজন লাফিয়ে বের হতে দেখেছেন তারা। কিন্তু সেখানে ফায়ার সার্ভিস বড় সিঁড়ি লাগিয়ে দেয়াল ভেঙে অনেককেই বের করতে পারত। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট যারা এসেছেন তাদের। দোতলায় থাকা কাচ্চি ভাইয়ের আরেকটি বড় হলরুম ছিল তিনতলায়। সেখানেও খাবার পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া এলিয়ন নামে একটি পাঞ্জাবির শোরুম রয়েছে। কাচ্চি ভাইয়ের রান্নাঘর দিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় আটকে পড়া লোকজন অনায়াসে বের হতে পারতেন। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলার পেছনে যে বড় জানালা ছিল সেটি সম্প্রতি নতুন করে বন্ধ করা হয়। ওই দেয়াল ভেঙে ফেলা সম্ভব ছিল। 

ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, আগুন লাগার পর প্রথমে নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শুরু করা হয়। আগুন নেভানোর পর ভীষণ ধোঁয়া তৈরি হয়। ওই সময় বিদ্যুৎ ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি টিম ভাগ হয়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। 

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, কাচ্চি ভাই থেকে বের হয়েই তৃতীয়তলায় থাকা ইলিয়ন নামের একটি পোশাকের দোকানে আশ্রয় নিয়েছিলেন অনন্ত ৪৫ জন। কালো ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে সেখানে সবাই অচেতন হয়ে যান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে গিয়ে প্রথমেই দু-একজনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। বাকিদের পেয়েছিলেন অচেতন অবস্থায়। পরে তারাও মারা যান।

চুলা জ্বালিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোগ দিতে গিয়ে আগুন 

এদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চা চুমুকের মালিক জানিয়েছে, চা চুমুকের গ্যাসের চুলা যখন চালু ছিল, তখন একজন কর্মচারী ওই অবস্থায় সিলিন্ডারগুলো অন্য আরেকটি সিলিন্ডারে লাইন দিতে শুরু করে। এর মধ্যে যে সিলিন্ডার থেকে সংযোগ খোলা হয়, সেটিতে থাকা গ্যাস বের হয়ে আগুনের সংস্পর্শে এসে আগুন লেগে যায়। চা চুমুকের দুই মালিক আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান পুলিশকে জানান, আগুন অসতর্কতায় লেগেছে। এটি দুর্ঘটনা। 

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, চা চুমুকে ইলেকট্রিক চুলাও ব্যবহার হতো। গ্যাসের চুলা থেকে আগুন লাগলেও পরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যখন আগুন ছড়িয়ে পড়ে তখন সঙ্গে সঙ্গে ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুটি লিফট থাকলেও সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দোতলা থেকে সাত তলা পর্যন্ত অনেক ফ্লোরে লিফটের বিকল্প হিসেবে থাকা সিঁড়িতে প্রবেশের দরজা বন্ধ ছিল। আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, দ্বিতীয় থেকে পাঁচ তলা পর্যন্ত অনেক ফ্লোরে সিঁড়ির দরজা বন্ধ ছিল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা