বেইলি রোডে আগুন
শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৯:৫৩ এএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪ ১৩:১০ পিএম
বেইলি রোডের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ফাইল ফটো
লালমনিরহাট জেলার যুবক ফরিদুল ইসলাম তেজগাঁও সরকারি কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। কয়েক বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর থেকে নতুন করে জীবনযুদ্ধ শুরু হয় তার। নিজের পড়াশোনা, সংসারের দায়িত্ব নিয়ে আয়ের জোগান দিতে পাঠাও অ্যাপে ফুড ডেলিভারি দিতেন তিনি। রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে অগ্নিকাণ্ডের দিনও মাস্টার্সের একটি পরীক্ষা ছিল তার। সেদিন রাতে ওই ভবনে গিয়েছিলেন ফুড ডেলিভারি নিতে। খানা’জ দাবা রেস্টুরেন্টে প্রবেশের একটু পরে শুনতে পান আগুন লেগেছে। ভবনের চতুর্থ তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়া করে নিচে নামতে গিয়েও পারেননি ফরিদুল। তার অভিযোগ, আগুন লাগার পর ভবনের গেইট তালাবদ্ধ করা হয়। সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চাইলেও ততক্ষণে কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎও চলে যায়। দেখতে পান, পুরো ভবনে আগুন। একপর্যায়ে ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তাকে উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। পরে তাকে ভর্তি করা হয় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
গতকাল শনিবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ফুড ডেলিভারি করতে খান’জ দাবায় গিয়েছিলাম। তখন খুব সম্ভবত রাত সাড়ে ৯টা। আমার মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিয়ে ফুড ডেলিভারি দিতে বের হই। রেস্টুরেন্টে ঢোকার কয়েক মিনিট পরই শুনি আগুন লেগেছে। মুহূর্তেই দৃশ্য পাল্টে যায় ভবনের। বাঁচার জন্য যে যুদ্ধ করেছি তা বলে বোঝাতে পারব না। আল্লাহ যে আমার জীবন ভিক্ষা দিয়েছেন, এজন্য লাখো শুকরিয়া।
তিনি বলেন, আগুনের খবর পেয়ে খানা’জ থেকে বেরিয়েই দেখি ধোঁয়া আর অন্ধকার। নিচের দিকে নামতে গিয়ে দেখি মূল দরজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ওখানে একটিই এক্সিট পয়েন্ট। ওইটায় আগুন লাগার কারণে কোনো লোক বের হতে পারেনি। খানা’জ-এর ভেতরেও যেতে না পেরে ধোঁয়া পেরিয়ে ৭ তলার ছাদের দিকে যেতে থাকি। আমি ৫ তলা পর্যন্ত উঠি। শরীর চলছিল না, কারণ নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। এই বুঝি নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এলো, গায়ের জামা খুলে মুখ-নাক বেঁধে ফেলি। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে ছাদে যাই।
তিনি বলেন, ছাদে চারদিকে কালো ধোঁয়ার মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা ছিল। ওখানে প্রায় ৮০ জন লোক ছিল। পুরো ভবনে রেস্টুরেন্ট থাকায় সরু সিঁড়িতেই সব গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। একপর্যায়ে ওই সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরণ হতে হতে সিঁড়ি দিয়ে আগুন চলে আসে ছাদে। ছাদে আগুন চলে আশায় বাঁচার আশা একদমই ছেড়ে দিই। চোখের সামনে বেশ কয়েকজনকে দেখেছি, প্রাণ বাঁচাতে লাফ দিয়েছেন ভবন থেকে। শুনেছি একজন মারা গেছেন। একজনের কোমর ভেঙে গেছে। আরেকজনকে ধরে ফেলি। তিনি লাফ দিতে চেয়েছিলেন। এমন এক অবস্থায় ছিলাম, ধোঁয়ায় নিঃশ্বাসও নেওয়া যায় না; কিছু দেখাও যায় না। শুধু কালো ধোঁয়া নাক-মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল। এটাই মানুষকে অসুস্থ করেছে বেশি।
তিনি জানান, আজ (গতকাল) তাকে চিকিৎসকরা ছাড়পত্র দিয়েছেন। আগামীকাল (আজ) তার শেষ পরীক্ষা। পরীক্ষা দিয়ে গ্রামের বাড়ি যাবেন; মা ভাই-বোন ও স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে।
ফরিদুলের মতো অগ্নিকাণ্ডে কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত মেহেদী হাসানের চিকিৎসা চলছে একই হাসপাতালে। পাশের বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তার স্ত্রী উম্মে হাবিবা সুমাইয়া।
মেহেদী হাসান জানান, চীন থেকে তাদের এক বন্ধু এসেছেন। স্ত্রীকে নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে বেইলি রোডে দেখা করতে গিয়েছিলেন তারা। খান’জ-এ উঠে খাবারের মেন্যু যখন হাতে নেন, ঠিক তখনই শোনেন আগুন লেগেছে। মেহেদী হাসান বলেন, ‘ওইদিনের আগুনের ভয়াবহতা আর মনে করতে চাই না।’ ওই মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সোয়া ২ ঘণ্টা আমরা একটা ওয়াশরুমে আটকা ছিলাম। ওখানে বালতি ছিল, পানি ছিল। আমরা বেশ কয়েকজন ওইখানে ছিলাম। আমার ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইলে কানেক্ট ছিলাম। একপর্যায়ে বাঁচার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তবে ভেঙে পড়িনি। হয় মরব নয় বাঁচব। আমি একহাতে ফোনে ছিলাম, অন্য হাতে স্ত্রীর মাথা, হাত ও মুখে পানি ঢেলেছি; যাতে ও জ্ঞান না হারায়। পরে রেসকিউ টিম আমাদের উদ্ধার করে। আমরা যেখানে ছিলাম, ওটা বড় একটা শোরুম ছিল। আমরা ছিলাম পেছনের দিকে আর আগুন ছিল সামনে।
মেহেদী হাসানের বিপরীত পাশের বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন তার চীনপ্রবাসী বন্ধু আবরার ফারদিন। তিনি চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ওই দেশেই চাকরি করেন। কিছুদিন আগে দেশে এসেছেন। তিনি বলেন, পরিচিত এক রোগীকে রক্ত দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ওই ভবনের নিচে যাই। শরীরটা খারাপ লাগছিল। তাই কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল। তখন ওদের বললাম, চল কোথাও কিছু খেয়ে নেই। খানা’জ-এর সামনে আড্ডা দিচ্ছিলাম তাই সেখানেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসতেই শুনি, আগুন লেগেছে। ওয়েটারসহ সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। এরপর আমরা বের হই। তার আগেই পুরো ভবনের আলো নিভে যায়। একদম অন্ধকার। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছিল। নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না। আমার সেন্স কাজ করছিল না। ওপরের দিকে ওঠার পর ওদের হারিয়ে ফেলি। ওপর থেকে সবাই চিৎকার করে বলছিল ওপরে আসবেন না। সবাই নিচে যান। ওপরে আগুন। আমি দৌড়ে আবার নিচে যাই। দ্বিতীয় তলায় পৌঁছার পর আগুনের সামনে পড়ি। একদম মুখোমুখি। ওদেরকে খুঁজে না পাওয়ার কারণে আবার তিনতলায় যাচ্ছিলাম। কেউ একজনের ধাক্কা খেয়ে ওখানেই পড়ে জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফেরার পর আস্তে আস্তে ছাদে চলে যাই। সেখানে গিয়ে শুয়ে পড়ি। ওখানে কিছু আপু ও ভাইয়া ছিল; উনারা আমার মাথায় পানি ঢালে। এরপর বাসায় ফোন দিয়ে সবাইকে পরিস্থিতি জানাই। বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়ে শেষ বিদায়টা নিই সবার কাছে। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার, ছাদে নামাজ পড়ার জায়গা ছিল। আমি তওবা করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়েছিলাম।
সবাইকে বলছিলাম, শান্ত থেকে সবাই দোয়া পড়েন। একটা আপুর সঙ্গে দুইটা বাচ্চা ছিল। স্বামীও ছিলেন। তিনি প্রচণ্ড সাহসী। সবাইকে ভরসা দিচ্ছিলেন। ছাদে যত কাগজ বা দাহ্য জিনিস ছিল, সব ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা চেষ্টা করছিলাম ভবনের পেছনের দিকটায় থাকার। আগুন চলে আসছিল ছাদের সামনের দিকে। তাই সামনের দিকে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আশপাশের সবাই পানি চাইছিল। পিপাসায় কাতরাচ্ছিল সবাই। গরম আর ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছিল। সবাই জুতায় পানি দিয়ে ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পরে ফায়ার সার্ভিস পানি দিলে আমরা শরীর ভিজিয়ে নিই।
যখন তারা কেএফসির ওই পাশ থেকে উত্তর পাশে পানি দেয়, তখন ছাদের আগুনটা একটু নিয়ন্ত্রণে আসে। আগে বাচ্চা, মহিলা ও বয়স্করা নামেন। এরপর আমরা ছেলেরা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসি। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে দেখি হাসপাতালে।