বেইলি রোডে আগুন
সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৪ ২২:২৩ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪ ১৪:০৫ পিএম
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ভবনটিতে আগুন লাগে। প্রবা ফাইল ফটো
বেইলি রোডে গ্রিন কজি কটেজ নামের পোড়া ভবনের সামনে এখনো বিপুলসংখ্যক উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ ভিডিও করছেন, কেউ ছবি তুলছেন। কেউবা দাঁড়িয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে দেখছেন গ্রিন কটেজের দগ্ধ দৃশ্য। বৃহস্পতিবার রাতের আগুনের পর শনিবার (২ মার্চ) তদন্তকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা পরিদর্শন করেছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, ভবনের অতিদাহ্য ফলস সিলিংয়ের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। আর ধোয়া থেকে কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস সৃষ্টি হয়ে নিশ্বাস বন্ধ হওয়ায় এত প্রাণহানির ঘটনা।
শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, সিআইডির ক্রাইম সিন বিভাগ বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করেছে। পুলিশের বাধায় ভেতরে যেতে পারেননি সবাই। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল ভবনটি ঘুরে দেখলেও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা না বলে দ্রুত চলে যান। পাশাপাশি তিতাস গ্যাস ডিস্টিভিউশন কোম্পানির প্রতিনিধি দলও ভবনটি পরিদর্শন করেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কোনো প্রতিনিধি ভবনটি পরিদর্শন করেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিতাস গ্যাসের প্রতিনিধি দল জানায়, ওই ভবনে তিতাস গ্যাসের সংযোগ ছিল। পাশাপাশি ভবনটির সব রেস্টুরেন্টে ইলেকট্রিক চুলার ব্যবহার ছিল। আগুনের উৎপত্তিস্থল চুমুক ফাস্টফুডের গ্যাসের চুলা বা ইলেক্ট্রিক চুলা বলে ধারণা করছে সিআইডি। তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লা বলেন, অগ্নিদুর্ঘটনার পর তিতাসের ইমার্জেন্সি টিম ও পৃথক আরেকটি তদন্ত দল ভবনটি পরিদর্শন করছে। ভবনের পাঁচ বা ছয়তলায় একটিমাত্র আবাসিক সংযোগ ছিল তিতাস গ্যাসের। সেই সংযোগ অক্ষত অবস্থায় পেয়েছে অনুসন্ধান দল। ভবনে তিতাসের আর কোনো সংযোগ নেই। ভবনটির অন্যান্য ফ্লোরে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হতো বলে তিনি জানান।
সিআইডির ডিআইজি (ফরেনসিক) একেএম নাহিদুল ইসলাম বলেন, তারা পুড়ে যাওয়া ভবন থেকে বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করেছেন। প্রাথমিকভাবে তারা চুমুক রেস্টুরেন্টের ইলেক্ট্রিল চুলা ব্যবহার করার প্রমাণ পেয়েছেন। গ্যাসের লিকেজের কোনো অস্তিত্ব পাননি। অথবা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণেরও কোনো আলামত পাননি। তাদের মনে হয়েছে, আগুন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়েছে।
ধাতব ফলস সিলিংয়ে আগুন দ্রুত ছড়ায়
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে অষ্টম তলার ছাদে চিলেকোঠা পর্যন্ত অতিদাহ্য ফলস সিলিংসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হয়েছে। এ ডিজাইনে যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো অতিদাহ্য পদার্থ। এগুলো দ্রুতগতিতে আগুন ছড়ায়। এসব ফলস সিলিংয়ের আগুনের ধোঁয়া বিষাক্ত ধোঁয়ার মতোই মারত্মক। ওই ধোঁয়ায় শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষ মারা যায়।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের অনেকেই জানিয়েছেন, বাইরে থেকে সুদৃশ্য এবং ভেতরেও নকশা করা ভবনটিতে একটিমাত্র সরু সিঁড়ি রয়েছে । দুটি লিফটে লোকজন ওঠানামা করার কারণে সিঁড়ির ব্যবহার কম ছিল। সে কারণে সিঁড়িতে রেস্টুরেন্টের রান্নার জন্য আনা গ্যাস সিলিন্ডারগুলো সারি করে রাখা থাকত। ছাদটিও পুরোপুরি খোলামেলা না। সেখানে ছিল রেস্টুরেন্ট ও মসজিদ। আগুন লাগার পর চার থেকে সাততলা পর্যন্ত বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খেতে আসা নারী ও শিশুসহ কেউ কেউ যারা ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন তাদের বাঁচানো গেছে। দোতালায় কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টে আসা অধিকাংই ছাদ পর্যন্ত যেতে পারেননি।
উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, আগুন নেভানোর পর ভেতরে ধোঁয়া ও তাপের কারণে তাদের উদ্ধারকাজে বেগ পেতে হয়। ছাদে থাকা লোকজনকে উদ্ধারের পর ভেতরে গিয়ে অচেতন অবস্থায় নারী-শিশুসহ অনেককে ফ্লোরে পড়ে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সে সময় অনেকের নাকমুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। সবচেয়ে বেশি লোককে উদ্ধার করা হয়েছে তিন ও চারতলা থেকে।
ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টর তালহা বিন জসিম জানিয়েছেন, ভবনে আগুন লাগার পর নিচতলায় চুমুকের কিচেন পুরোপুরি পুড়ে গেলেও আরেকটি অংশ তেমন পোড়েনি। দোতালায় কাচ্চিভাই রেস্টুরেন্ট সম্পূর্ণ পুড় গেছে। তিনতলা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ওই তলায় ইলিয়ন নামে পাঞ্জাবির যে শোরুম ছিল তা অক্ষত রয়েছে। চারতলায় খানাস ও ফুকো রেস্টুরেন্টের আংশিক পুড়েছে। পাঁচতলায় পিজ্জা ইন পুরোটা পুড়ে গেছে। ছয়তলায় থাকা জাসদি ও স্ট্রিট ওভেন আংশিক পুড়েছে। সাততলায় অ্যামবেশিয়া আংশিক পুড়েছে। তবে চিলেকোঠায় তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।
আগুনের প্রত্যক্ষদর্শী হারিসুর রহমান সোহাগ বলেন, যে রেস্টুরেন্টে (চুমুক) আগুন লাগে সেই রেস্টুরেন্টের বাইরে সিলিন্ডার ছিল। চুমুকের একটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিল সিঁড়ির গোড়ায়। আগুনে ওই সিলিন্ডারটি ব্যাপক শব্দে বিস্ফোরণের পর আগুন ওপরের দিকে উঠে ভবনের ফলস সিলিংগুলো জ্বলা শুরু করে। এরপর একে একে ৭ তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। আগুন লাগার পর তারা সবাই মিলে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে তৎপর ছিলেন। তখন উপরে থাকা লোকজনকে সিঁড়ি ব্যবহার না করে ছাদে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।