বেইলি রোডে আগুন
আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৪ ১১:০৩ এএম
বেইলি রোডে আগুন নিহত নাইমের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা নান্টু হাওলাদার। প্রবা ফটো
২৮ বছর সিঙ্গাপুরে প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের সৈয়দ মোবারক হোসেন কাউসার। এবার পাড়ি জমাবেন ইতালি। সব কাগজপত্র ফাইনালÑ এমন সুখবরটা পেয়েই বৃহস্পতিবার রাজধানীর বেইলি রোডের কাচ্চি ভাইয়ে খেতে গেলেন স্ত্রী স্বপ্না, তিন সন্তান কাশপিয়া, নুর ও আব্দুল্লাহকে নিয়ে। নানা রকম রেস্টুরেন্টে গাদাগাদি ওই আটতলা ভবনে আগুনের ঘটনায় এক রাতেই নিঃশেষ হয়ে গেল পরিবারটি। শুধু এই পরিবার নয়, আগুনের অতর্কিত হানায় আরও অনেক পরিবারের কাছে কালরাত্রি হয়ে উঠেছে বৃহস্পতিবারের রাতটি। আগুন লাগে রাত পৌনে ১০টার দিকে। মুহূর্তে সে আগুন গ্রাস করে নেয় পুরো ভবন। কেড়ে নেয় একের পর এক তরতাজা জীবন। উদযাপনের যত আয়োজন সব চাপা পড়ে যায় বিভীষিকার তমসায়। এ এমন এক ট্র্যাজেডি, যার বর্ণনা ভাষার অতীত। ভাবতে গেলেই শিউরে উঠতে হয়। বারবার চোখ ভেসে যায় জলে। প্রবল শোকের চাপ বিদীর্ণ করে হৃদয়।
সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ এ ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬। এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহত ১৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নিহত ৪৬ জনের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৪০ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনজনের মরদেহ শনাক্ত হলেও হস্তান্তর হয়নি। তারা হলেনÑ কাস্টম ইন্সপেক্টর শাহ জালাল উদ্দিন (৩৫), তার স্ত্রী মেহেরুন নেসা হেলালি (২৪) ও তাদের মেয়ে খাইরুন্নেসা (৪)। বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
ভস্মীভূত গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে তদন্ত কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা। বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুড়ে যাওয়া ভবন থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও ফায়ার সার্ভিস।
ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিরোধীদলীয় নেতা জিএম কাদের এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ১০ জন চিকিৎসাধীন। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন একজন। আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজে নিয়েছেন জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আহতদের চিকিৎসায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ধোঁয়ার কারণে অনেকের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। যারা বের হতে পারেননি তারা মারা গেছেন। আর যারা বের হতে পেরেছেন তারা এখনও বেঁচে আছেন। তবে কেউই শঙ্কামুক্ত নন। আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি।
মামলা হচ্ছে, আটক ৩
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে আগুনের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনবে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ডিএমপির মুখপাত্র খ. মহিদ উদ্দিন জানান, ভবনের নিচের দোকান চা চুমুকের মালিক আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান রিমনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলা রুজুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে। কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জয়েন উদ্দিন জিসানও আমাদের হেফাজতে রয়েছেন। আমরা তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছি। একটি ভবনে কীভাবে এতগুলো রেস্টুরেন্ট হয়েছে, সেখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কিনাÑ সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। প্রতিটি রেস্টুরেন্টে অতিরিক্ত গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ ছিল। সিঁড়িতেও সিলিন্ডার রাখা ছিল। ফলে আগুন লাগার পর লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেনি।
ভবন মালিকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আগেই বলেছি কারও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারও গাফিলতি থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং থেকে প্রাণহানি
এত বেশি প্রাণহানির কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক প্রবীর চন্দ্র দাস জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হচ্ছেÑ কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং। যাকে বলা যায় বিষাক্ত ধোঁয়া। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যারা মারা গেছেন তারা কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ একটা বদ্ধ ঘরে বের হতে না পারা ধোঁয়া শ্বাসনালিতে চলে যায়। প্রত্যেকেরই তা হয়েছে। যাদের বেশি হয়েছে, তারা মারা গেছেন। তবে যারা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, তারাও কেউ শঙ্কামুক্ত নয়।’
শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কেউ আটকে পড়লে ধোঁয়ায় তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। গরম কালো ধোঁয়া গলা দিয়ে প্রবেশের সময় নরম টিস্যু পুড়ে যায়, যা শরীরে বিষের মতো প্রবেশ করে। যারা আগুনে পুড়ে মারা যান, তাদের শরীরের কোনো না কোনো অঙ্গের ভেতরে তাপে বা পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। আবার আগুনের ধোঁয়ার কারণে শ্বাস নিতে না পারায় কারও কারও মৃত্যু হয়। শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়া মানুষ এক দণ্ড বাঁচতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় অক্সিজেনের। আগুনের ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হয়। এই কার্বন মনোক্সাইডের মধ্যে শ্বাস নিতে গেলে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে মানুষ মারা যায়।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, মূলত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে এত প্রাণহানি হয়েছে। পুড়ে মারা গেছে মাত্র তিনজন। বাকি সবাই মারা গেছে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে। তিনি বলেন, ভবনের তৃতীয় তলায় কাপড়ের দোকানটি তেমন একটা পোড়েনি। ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার চিঠি দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করেনি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন আরও বলেন, ‘এই ভবনে কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না। এ কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, নিচতলার সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। তা ছাড়া নিচতলায় চায়ের চুমুক নামে একটি দোকানে প্রথমে দাউদাউ আগুন লাগার একটি ভিডিও পাওয়া গেছে।’ বেইলি রোডের আরও বেশ কয়েকটি ভবনেও অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গিয়ে র্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নিচতলার ছোট একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত। অনেকগুলো সিলিন্ডার থাকায় সেগুলো বিস্ফোরিত হয়ে ভবনে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে যায়।
সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন ভয়াবহ হয়ে ওঠে
গ্রিন কোজি কটেজে আগুনের সূত্রপাত নিচতলায় চা চুমুক নামে একটি দোকানের কিচেন থেকে। শুরুতে আগুন লাগার একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায়, শুরুতে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে নিচতলায় গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার শোরুম সংলগ্ন চায়ের দোকানে আগুন লাগে। প্রায় ১৫ মিনিট পর বিকট শব্দে একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলে দাউদাউ করে আগুন দোতলা-তিনতলায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশ কনস্টেবল আজাদ বলেন, আমরা ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওপরের ফ্লোরগুলোতে।
ডিসকাউন্ট থাকায় ছিল উপচে পড়া ভিড়
বিরিয়ানির দোকান কাচ্চি ভাই লিপইয়ার উপলক্ষে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় তলায় থাকা এই রেস্টুরেন্টে ছিল উপচে পড়া ভিড়। এমন একটা সময়ে রাত পৌনে ১০টার দিকে ভবনটিতে আগুন লাগে। ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাপ থাকায় অনেকেই সেখানে আটকা পড়েন। প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে তাদের অনেকে মারা যান।
ভবনে আরও যা ছিল
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আটতলা ভবনের নিচতলায় স্যামসাং মোবাইল ফোনের শোরুম ও গেজেট অ্যান্ড গিয়ার নামে দুটি ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম বিক্রির দোকান এবং শেখলিক নামের একটি জুসবার (ফলের রস বিক্রির দোকান) ও চায়ের চুমুক নামে একটি দোকান ছিল। দ্বিতীয় তলায় ছিল কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁ, তৃতীয় তলায় ইলিয়ন নামের একটি পোশাকের (পাঞ্জাবি) দোকান, চতুর্থ তলায় খানা’স ধাবা ও ফুকো নামের দুটি রেস্তোরাঁ, পঞ্চম তলায় পিৎজা ইন নামের একটি রেস্তোরাঁ, ষষ্ঠ তলায় জেসটি ও স্ট্রিট ওভেন নামের দুটি রেস্তোরাঁ এবং ছাদের একাংশে অ্যামব্রোশিয়া নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। এ ছাড়া সপ্তম তলায় হাক্কা-ঢাকা নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। আগুনের সময় যারা আটকে পড়ে মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগ কাচ্চি ভাইয়ের ক্রেতা ও কর্মচারী।
রেস্তোরাঁর অনুমোদন ছিল না
রাজউক সূত্র জানায়, ভবনটির অনুমোদন আটতলার। এর মধ্যে প্রথম পাঁচতলা অফিস করার জন্য বাণিজ্যিক এবং ওপরের তিনতলা আবাসিক ব্যবহারের জন্য নকশা অনুমোদন করে রাজউক। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য যে পাঁচতলার অনুমোদন রয়েছে সেখানে রেস্টুরেন্ট করার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। ওই পাঁচটি তলা শুধু অফিস হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি ছিল।
৪৩ জনের পরিচয় শনাক্ত
নিহত ৪৬ জনের মধ্যে ৪৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৭৫ জনকে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম হেদায়েতুল ইসলাম জানান, লাশ বহনের জন্য নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত ৩ জনের পরিবার এই অর্থ নিয়েছে। বাকিরা সচ্ছল হওয়ায় অর্থ নেয়নি। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য আপাতত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
যে ৪০ জনের লাশ হস্তান্তর হয়েছে
যাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে তারা হলেনÑ ঢাকার নুরুল ইসলাম (৩২), পপি রায় (৩৬), সম্পুন্না পোদ্দার (১২), কুমিল্লার জান্নাতিন তাজরীন (২৩), ঢাকার নাজিয়া আক্তার (৩১), আরহাম মোস্তফা আহমেদ, ঢাকার মাইশা কবির মাহি (২১), মেহেরা কবির দোলা (২৯), কুমিল্লার পম্পা সাহা (৪৭), মাদারীপুরের জিহাদ হোসেন (২২), মৌলভীবাজার কুলাউড়ার আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান শামীম (৬৩), যশোরের কামরুল হাবিব জামান রকি (২০), টাঙ্গাইলের মেহেদী হাসান (২৭), কুমিল্লার ফৌজিয়া আফরিন রিয়া (২২), কুমিল্লার নুসরাত জাহান শিমু (১৯), ঢাকার সৈয়দা ফতেমাতুজ জোহরা (১৬), ঢাকার সৈয়দ আব্দুল্লাহ (৮), ঢাকার স্বপ্না আক্তার (৪০), মুন্সীগঞ্জের জারিন তাসনিম প্রিয়তি (২০), নারায়ণগঞ্জের শান্ত হোসেন (২৩), ভোলার দিদারুল হক (২৩), হবিগঞ্জের রুবি রায় (৪৮), হবিগঞ্জের প্রিয়াঙ্কা রায় (১৮), ঝালকাঠির তুষার হাওলাদার (২৬), পটুয়াখালীর জুয়েল গাজী (৩০), নোয়াখালীর আসিফ (২১), চাঁদপুরের মিনহাজ উদ্দিন (২৫), ভোলার নয়ন (১৭), পাবনার সাত্তার হোসেন (২০), পিরোজপুরের তানজিলা নওহিন (৩৫), ঢাকার লুৎফুন নাহার লাকী (৫০), শেরপুরের শিপন মিয়া (২১), ঢাকার সংকল্প (৮), ঢাকার আলিশা (১৩), বরিশালের নাহিয়ান আফিন (১৯), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আমেনা আক্তার (১৩), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশরাফুল ইসলাম (২৫) ও সৈয়দ মোবারক হোনের (৪৮), ঢাকার নাফিসা ইসলাম (২০), বরগুনার নাঈম (১৮)।
অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না
ভবনের ব্যবসায়ীরা জানান, অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিলে না ভবনটিতে। ছিল দুটি লিফট ও ওঠানামার জন্য একটি মাত্র সরু সিঁড়ি। তা-ও ভবনের মাঝামাঝি জায়গায়। এ ছাড়া ছিল না বায়ুপ্রবাহ কিংবা বের হওয়ার বিকল্প পথ। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে শহরের অন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে রাজধানী উন্নয়ন করপোরেশন রাজউককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভবনটিকে আগেই নিরাপত্তাসংক্রান্ত নোটিস দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘আমরা মনে করি যারা ব্যবসা করেন তাদের সবার অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার। এই ভবনে ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও ভবন নির্মাণ করতে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছিল কি না, তা-ও আমরা তদন্ত করে দেখব। এজন্য কমিটি করেছি। আমরা দেখতে চাই কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না। আগুনে অনেকে মারা গেছেন। এই মৃত্যু কখনও মেনে নেওয়া যায় না।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় তারা। প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ৯টা ৫৬ মিনিটে। পরে আগুনের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়লে আরও ১২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে পুলিশ, আনসার, র্যাব ও এনএসআই। ১৩টি ইউনিটের দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠান বাতিল
বেইলি রোডের বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি অগ্নিকাণ্ডের পরপরই রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহের চলমান অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করার পর পুলিশপ্রধান হতাহতদের দেখতে গভীর রাতে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে যান।
এ মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৪-এর শুক্রবারের মতবিনিময় সভা বাতিল করা হয়েছে। সাধারণত এ মতবিনিময় সভার পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের গেট টুগেদার হয়ে থাকে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, আগুনে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাসিরুল ইসলামের বুয়েটে পড়ুয়া কন্যা লামিশা ইসলাম প্রাণ হারিয়েছেন। আইজিপি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি আহত ও চিকিৎসাধীনদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
স্তব্ধ বেইলি রোড
রাজধানীর বেইলি রোড সবার কাছেই এক পরিচিত নাম। এই এলাকা প্রসিদ্ধ ভোজনরসিকদের কাছেও। হরেকরকম খাবারের স্বাদ নিতে সকাল থেকে ভিড় দেখা যেত এই এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্টে। বৃহস্পতিবার আগুনে ৪৬ জনের প্রাণহানির পর শুক্রবার থেকে নীরব-নিথর হয়ে গেছে এলাকাটি। পুড়ে যাওয়া ভবনটি একনজর দেখতে হাজির হন হাজার হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়াও এসেছেন ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা অনেকেই। সবার নজর ভবনটির দিকে। তাদের চোখমুখে বিষাদের ছাপ। পোড়া গন্ধে ভারী বাতাস চিরে বেরিয়ে আসছিল দীর্ঘশ্বাস। ভবনের সামনের অংশ ঘিরে রাখে পুলিশ। ভবনের আশপাশের ভবনে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সেগুলো মেরামত করতে দেখা যায়।
পুলিশ হাসপাতালে শিশুসহ ২ জনের মৃত্যৃ
আগুনের ঘটনায় আহতদের মধ্যে শিশুসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে বৃহস্পতিবার রাতেই। তাদের একজন তিন বছেরর শিশু আয়াত। অন্যজন হলোÑ কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ক্যাশিয়ার রকি। ওই হাসপাতালে ভর্তি করা আহতদের মধ্যে অবস্থার অবনতি হওয়ায় চারজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি রেজাউল হায়দার চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বেইলি রোডে আগুনের ঘটনায় শিশু আয়াত ও কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রকি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাদের অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এ দুজনের মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে। দুজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আয়াতের মা ও বোনও মারা গেছে।