শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৪ ০০:০৯ এএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪ ১১:১৬ এএম
নাজমুল (বাঁয়ে) ও মিনহাজ (ডানে)। প্রবা ফটো
‘রাত থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। বিভিন্ন হাসপাতালে ও মর্গেও খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। এখন পর্যন্ত ছেলের লাশটা ছুঁয়ে দেখতে পারিনি।’ কথা বলতে বলতে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েন নাজমুল হাসানের বাবা নজরুল ইসলাম। ছেলের লাশ শনাক্ত করতে না পেরে শুক্রবার (১ মার্চ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বিলাপ করছিলেন তিনি। নাজমুল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
এর একটু অদূরেই জরুরি বিভাগের অপেক্ষা কক্ষে বিলাপ করছিলেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী মিনহাজ উদ্দিনের ষাটোর্ধ্ব মা আমেনা বেগম। ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। তার চারপাশ ঘিরে স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। কোনো সান্ত্বনাই যে বুক ঠাণ্ডা করতে পারেনি ছেলেহারা এই মায়ের।
সপ্তাহের শেষ দিন পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে একটু ভালো সময় কাটাতে গিয়েছিলেন যারা তাদের মধ্যে ৪৬ জন হারিয়েছেন প্রাণ। সেই শোক আর আর্তনাদে স্তব্ধ ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে থাকা একটি পোড়া মরদেহ নিয়ে নিজেদের সন্তান দাবি করেছেন নাজমুল ও মিনহাজ দুইজনেরই পরিবার। পেটে অপারেশনের দাগ, সামনের দাঁত একটু উঁচু এবং হাতে থাকা হাতঘড়ি দেখে মিনহাজকে শনাক্ত করেন স্বজনরা। কিন্তু ওই লাশ নাজমুলের দাবি করে বাদ সাধেন নাজমুলের স্বজনরা। তারা ওই মরদেহের বুকের অংশ দেখে দাবি করেছেন, পোড়া মরদেহটি নাজমুলের।
এ অবস্থায় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে মরদেহ শানাক্ত করতে নাজমুল ও মিনহাজের বাবা-মায়ের নমুনা নিয়েছে সিআইডির ফরেনসিক টিম। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, কয়েকটি মরদেহ এত বেশি পুড়েছে যে, খালি চোখে শনাক্ত করা সম্ভব না। এ কারণে মরদেহ পেতে দুই পরিবারকেই ডিএনএ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ওই রাতে বেইলি রোডের কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিল নাজমুলসহ চার বন্ধু। তাদের মধ্যে দুই বন্ধু ফিরলেও খোঁজ মেলেনি নাজমুলের। তার বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বন্ধু রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে পারলেও নাজমুল আটকা পড়ে। তার এক বন্ধু জুনায়েদ ফোন দিয়ে আমাদের জানায়, নাজমুলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিন তলায় আটকা পড়েছে। এরপর আমরা ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে তাকে খুঁজে পাইনি। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গেও তাকে খুঁজছি, কিন্তু পাইনি।’ তিনি বলেন, ওখানে ওরা দুই বন্ধু আটকা পড়ে। একজনের মরদেহ রাত সাড়ে ৩টার দিকে শনাক্ত করে নিয়ে গেছে তার বাবা-মা। এখনও নাজমুলের খোজ মেলেনি।
বিলাপ করতে করতে নাজমুলের মা হাসিনা বেগম বলেন, আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। খবর পেলাম আগুনে আটকা পড়েছে। কতবার কল দিছি। মোবাইল বন্ধ পাইলাম। এরপর আর ফিরল না। আমার নাজমুল চলে গেল। পড়াশোনা ছাড়া কিছু বুঝত না ও। কত স্বপ্ন ছিল! সব শেষ হয়ে গেল!
একই হাসপাতালে এসেছিলেন মিনহাজের সহকর্মী আনিসুল ইসলাম। তিনি বলেন, বুহস্পতিবার সন্ধ্যায় মিনহাজ কারওয়ান বাজারের কর্মস্থল থেকে তার এক বন্ধুর সঙ্গে বিরিয়ানি খেতে বেইলি রোডের কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁয় যান। মিনহাজ প্রতিদিন কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে বাসায় ফিরলেও রাত পৌনে ১২টা পর্যন্ত খোঁজ না পেয়ে তার বড় ভাই ব্যাংক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম চিন্তিত হয়ে পড়েন। রাত ১২টার পর মিনহাজের সঙ্গে খেতে যাওয়া তার ওই বন্ধু ফোন করে জানান, মিনহাজের সঙ্গে তিনি বিরিয়ানি খেতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেইলি রোডের সেই রেস্তোরাঁয় আগুন লেগেছে। তিনি দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়ে বেরিয়ে এলেও মিনহাজ ভেতরে আটকা পড়েছেন। এরপর কোনোভাবেই মিনহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তারা। এরপর ঘটনাস্থল যান তারা। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল। কিন্তু খোঁজ পাওয়া যায়নি মিনহাজের। একটি মরদেহ দেখে মিনজাদের মনে হলেও তা নিশ্চিত হতে হবে ডিএনএ পরীক্ষায়।
হাসপাতাল মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে মিনহাজের বড় ভাই আমিনুল ইসলাম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। তাঁর মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছিল না। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তারাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। মিনহাজের বাবা ওয়ালিউল্লাহ খান তার বড় ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বিলাপ করে বলেন, ‘এ কী হয়ে গেল! মিনহাজ ছাড়া এখন আমরা কিভাবে বাঁচব!’
মিনহাজের বন্ধু দেলোয়ার হোসেন বলেন, মিনহাজ ড্যাফোডিল থেকে অনার্স শেষ করে কাওরান বাজারে একটি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এছাড়া কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসসিতে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন তিনি। মিনহাজের বাবা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। তিন ভাইয়ের মধ্যে মিনহাজ সবার ছোট। তার মা-বাবা চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। রাতে তাদের মিনহাজের বিষয়ে কোনো কিছু জানানো হয়নি। শুক্রবার সকালে তারা কোনো মাধ্যমে মিনহাজের খবর জানতে পেরে হাসপাতালে ছুটে আসেন।