× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অ্যানেসথেশিয়া যখন মৃত্যুদূত

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:১৮ এএম

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১১:৩২ এএম

শিশু আয়হাম ও আয়ান। ছবি : সংগৃহীত

শিশু আয়হাম ও আয়ান। ছবি : সংগৃহীত

আয়ান আহমেদের পর আহনাফ তাহমিদ আয়হাম- একটি ঘটনা মন থেকে না মুছতেই খতনার মতো মামুলি অস্ত্রোপচারে রাজধানীতে আবার শিশুমৃত্যু। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে গত মঙ্গলবার খতনার পর আর জ্ঞান ফেরেনি শিশু আয়হামের। মর্মন্তুদ ওই মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে। অ্যানেসথেশিয়ার প্রটোকল নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বলা হচ্ছে, এই প্রটোকল সঠিকভাবে না মানার কারণেই ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। হাসপাতাল এবং চিকিৎসকের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। শুধু শিশু নয় অ্যানেসথেশিয়ার ভুলে রাজধানীতে পূর্ণবয়স্ক মানুষেরও মৃত্যু হয়েছে।

আয়হামের পরিবারের অভিযোগ, তাদের অনুমতি না নিয়েই শিশুটিকে ফুল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হয়। ওই অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পর তার আর জ্ঞান ফেরেনি। দেড় মাস আগে খতনা করাতে গিয়ে রাজধানীর সাঁতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আয়ান আহমেদের মৃত্যু হয়েছিল। ওই শিশুর পরিবারও একই অভিযোগ করেছিল। 

মঙ্গলবারের ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টার নামক প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত দুই চিকিৎসক এস এম মুক্তাদির ও মাহবুব মোরশেদকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। 

এদিকে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত বুধবার শিক্ষানবিস চিকিৎসক খতনা করতে গিয়ে শিশু আল-নাহিয়ান তাজবীবের গোপন অঙ্গের মাথার অংশ কেটে ফেলেন। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে বিজয় কুমার দে নামে এক উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারকে স্ট্যান্ড রিলিজ দেওয়া হয়েছে। 

দেশে আগে হাজামরা (খতনা করান এমন ব্যক্তি) অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া ছাড়াই শিশুদের খতনা করতেন। চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত ও মানুষ সচেতন হওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে সার্জারির মাধ্যমে খতনা করানোর প্রচলন বেড়েছে। এই খতনা করাতে গিয়ে কোনো কোনো শিশুকে ফুল অর্থাৎ পুরোপুরি অজ্ঞান করে আবার কোনো কোনো শিশুকে লোকাল অর্থাৎ পুরোপুরি অজ্ঞান না করে খতনা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অ্যানেসিথেওলজি অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও নার্সিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের সার্জারির জন্য অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার প্রয়োজন হয়। এটি ছাড়া কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার করা যাবে না। তবে সার্জারির জন্য অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার আগে যথাযথ প্রটোকল ফলো করতে হবে। রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি জানার জন্য পরীক্ষানিরীক্ষা করে সে অনুযায়ী সার্জারির প্র্রস্তুতি নিতে হবে।

কোনো ক্ষেত্রে কী ধরনের অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োজন পড়বে তা নির্ধারণ করতে হবে। অ্যানেসথেশিয়ার পর নির্ধারিত সময়ে রোগীর জ্ঞান না ফিরলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ যথাযথ মেডিসিন প্রয়োগে রোগীর জ্ঞান ফেরে।কিন্তু যিনি অ্যানেসথেশিয়া দেবেন তার ঠিক করতে হবে কোন রোগীর জন্য কী ধরনের অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ভুল হলে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে। 

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অ্যানেসথেশিয়া বিভাগের প্রধান ডা. এম আসাদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, একটা সময়ে অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হতো। কিন্তু এখন আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে অ্যানেসথেশিয়া ছাড়া কোনো অস্ত্রোপচার করা হয় না। অ্যানেসথেশিয়া দিলে শরীর বা তার কোনো অংশ অবশ হয়ে যায়। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় রোগী কোনো ব্যথা অনুভব করেন না। অ্যানেসথেশিয়ার একাধিক ধরন রয়েছে। শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশে ছোট অস্ত্রোপচারে কেবল ওই অংশটিকেই অবশ করা হয়।

এটি লোকাল অ্যানেসথেশিয়া নামে পরিচিত। আবার বড় অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর পুরো শরীর অবশ করে ফেলা হয়। এসব ক্ষেত্রে রোগী তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় চলে যান এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর আবার জেগে ওঠেন। তবে লোকাল বা ফুল যেটাই হোক অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার আগে প্রটোকল মানতে হবে। রোগীর শারীরিক পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে। যাদের জ্বর, ঠাণ্ডা, সর্দি-কাঁশি, শ্বাসকষ্ট, বক্ষব্যাধি বা হৃদযন্ত্রে ত্রুটি আছে তাদের অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার ন্যূনতম চার ঘণ্টা আগে খাবার বন্ধ রাখতে হবে। এর কম হলে অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পর খাদ্য রোগীর ফুসফুসে গিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। 

শিশু আয়হামের বাবার উদ্ধৃতি দিয়ে ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি একটি টেলিভিশনে বলেছেন, সার্জারির দুই ঘণ্টা আগে তাহমিদ খাবার গ্রহণ করেছিলে। এমনটি হয়ে থাকলে অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পর জটিলতা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে হয়তো মৃত্যুর কারণ বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি। 

আয়হামের বাবা ফখরুল আলম জানান, খতনা করানোর জন্য তার ১০ বছর বয়সি শিশু সন্তানকে গত মঙ্গলবার রাত পৌনে আটটার দিকে রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ খতনা শেষ হয়। এরপর এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও শিশুর চেতনা ফেরেনি। ছেলের কোনো সমস্যা হয়েছে কি না চিকিৎসকদের কাছে জানতে চান তিনি। কিন্তু চিকিৎসকরা কোনো সমস্যা হয়নি বলে তাকে আশ্বস্ত করেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে বলে জানান। 

ফখরুল আলম জানান, রাত দশটার দিকে তাকে জানানো হয়, তাহমিদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। দ্রুত অন্য হাসপাতালের আইসিইউতে নিতে হবে। কারণ তাদের ওখানে আইসিইউ নেই। পাশের একটি হাসপাতালে আইসিইউর জন্য যোগাযোগও করা হয়। রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ ওই হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সও চলে আসে। কিন্তু ততক্ষণে তাহমিদকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

 ফুল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার কারণে তাহমিদের মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ করে ফখরুল আলম বলেন, ‘অনুমতি না নিয়েই আমার ছেলেকে ফুল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগে ফুল অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে খতনা করতে গিয়ে একটি শিশুর মৃ্ত্যু হয়েছে- এ কারণে চিকিৎসকদের ফুল অ্যানেসথেশিয়া না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা সেটি না শুনে আমার ছেলেকে ফুল অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে মেরে ফেলল।’ এ ঘটনায় জড়িত চিকিৎসকদের শাস্তি দাবি করেন তিনি।

ঘটনার পরপরই ওইদিন রাতে হাসপাতালের মালিক এবং কর্তব্যরত দুই চিকিৎসকের নাম উল্লেখ করে হাতিরঝিল থানায় মামলা করে শিশুর পরিবার।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আওলাদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অভিযোগ পেয়ে রাতেই হাসপাতালের মালিক ডা. এস এম মুক্তাদির এবং অ্যানেসথেশিস্ট ডা. মাহবুব মোরশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। অপর আসামি সার্জন ডা. ইশতিয়াক আজাদকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ময়নাতদন্তের জন্য শিশুর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, ডা. মুক্তাদির জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারের মালিক। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অর্থোপেডিক সার্জন; ডা. মাহবুব একই হাসপাতালের অবেদনবিদ (অ্যানেসথেশিওলজিস্ট) বিভাগের চিকিৎসক। আর ডা. ইশতিয়াক ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক।

এদিকে শিশু তাহমিদের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই চিকিৎসককে দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ চৌধুরীর আদালত আসামির রিমান্ড ও জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে এ আদেশ দেন। এর আগে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই রুহুল আমিন আসামিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন।

আদালত রিমান্ড ও জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার জন্য হাসপাতালের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের শুধু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন আছে। হাসপাতালের অনুমোদন নেই। তাই এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছুদিন আগেও এমন একটি ঘটনা আমরা লক্ষ করেছি। সে ঘটনায় আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থাও নিয়েছি। এরকম দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিরুদ্ধে শুধু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে না, দোষীদেরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যাতে পরবর্তীতে আর কোনো প্রতিষ্ঠান এ রকম গুরুদায়িত্বে অবহেলা করতে সাহস না পায়। চিকিৎসায় অবহেলা পাওয়া গেলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা