খতনায় শিশু আহনাফের মৃত্যু
সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২২:১১ পিএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২৩:৩১ পিএম
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমীদ আয়হাম। প্রবা ফটো
শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমীদ আয়হামের খতনা করানোর সময় মেডিকেল বোর্ডে থাকা জেএস ডায়াগনিস্টক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারের পরিচালক ডা. এস এম মুক্তাদির এবং অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ডা. মাহমুদ মোরশেদের চিকিৎসক হিসেবে সরকারি কোনো সনদ পায়নি পুলিশ। তাদের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসির) সনদও ছিল না। তবে সার্জারি চিকিৎসক ইমতিয়াজ আজাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
বুধবার (২১ ফেব্রুয়ারি) হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আওলাদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, মাহবুব মোরশেদ এবং মুক্তাদির ওরফে মুক্তার সরকারি মেডিকেল থেকে পাস করা কোনো চিকিৎসক নয়। তারা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে নিজেদের সরকারি চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতেন। চিকিৎসা সেবা দিতে হলে চিকিসৎকদের অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) থেকে সনদ নিতে হয়। মুক্তাদির ও মাহবুবের সেই সনদও পাওয়া যায়নি। তবে ইসতিয়াক আজাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক। তিনি এখানে বসতেন। ব্যক্তিগত রোগীদের সার্জারি করতেন।
ওসি আওদাল হোসেন বলেন, মালিবাগ জেএস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারের পরিচালক মুক্তাদির। তার ছেলেও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সে আইমানের সহপাঠী। মূলত সেই সুবাদে আইমানের বাবা ফখরুল আলমের সঙ্গে মুক্তাদিরের পরিচয়। ছেলের খতনার জন্য কথা হলে ডা. মুক্তাদির তার হাসপাতালে আইমানকে আনার জন্য বলেন। তার কথায় খতনার জন্য কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য সোমবার ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয় আইমানকে। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে মঙ্গলবার খাতনার জন্য নির্ধারণ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, শিশুটিকে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার দায়িত্বে ছিল ডা. মাহবুব। কিন্তু তার কোনো সার্টিফিকেট ছিল না। মাত্র দুবছর ধরে তিনি অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগের প্র্যাকটিস করছেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ডা. মাহবুব বলেছেন, তিনি এখনও প্রাকটিস করছেন। অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকদের একটি অ্যাসোসিয়েশন রয়েছেন। এ ধরনের চিকিৎসা করতে হলে আগে সাটিফিকেট অর্জন করতে হয় এবং অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকদের যে অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে সেখানকার সদস্য হতে হয়। কিন্তু মাহবুব ওই অ্যাসোসিয়েশনেরও সদস্য নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, এ মৃত্যুর দায় কেউই এড়াতে পারে না। অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার সময় কোনো শিশুর মৃত্যু হয় এমন নজির খুব বেশি নেই। আমরা ধারণা করছি, ভুল ওষুধ অথবা ওষুধের ভুল প্রয়োগ হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলবে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি ঘটনার পর সার্জারি চিকিৎসক ইমতিয়াজ আজাদ পালিয়ে যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিশু আহনাফের মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা জেনেছি, মঙ্গলবার খতনার জন্য শিশুটিকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ডা. ইশতিয়াক নামক একজন সার্জন ছিলেন, আর ডা. মাহবুব মোরশেদ শিশুটির অ্যানেস্থেসিওলজিস্টস ছিলেন। অভিযোগ অনুসারে, অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার সময় শিশুটিকে অজ্ঞান করার পর আর তার জ্ঞান ফেরেনি।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালটির সব তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। আমরা সেগুলো পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনা করছি। যতটুকু পেয়েছি, প্রতিষ্ঠানটির হাসপাতাল কার্যক্রম চালানোর কোনো অনুমোদন ছিল না। তবে তাদের ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন রয়েছে। সুতরাং তারা যদি কোনো রোগীকে অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে থাকে, সেটি অন্যায় করেছে। আমরা আরও তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেব। যিনি অপারেশন করেছেন তার বিরুদ্ধে আমরা আমাদের আইন অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।
মঙ্গলবার রাতে খতনার সময় মালিবাগ জেএস ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে মারা যান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহমান তাহমীন। ওই ঘটনায় বাবা ফকরুল ইসলাম হাতিরঝিল থানায় মামলা করলে পুলিশ ওই মেডিকেল সেন্টারের পরিচালক ডা. এস এম মুক্তাদির ও মাহমুব মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে। বুধবার তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন জানানো হলে আদালত জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। তবে সার্জারি চিকিৎসক ইমতিয়াজ আজাদকে গ্রেপ্তার করতে পারিনি পুলিশ।