বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:০০ পিএম
বিশ্ব গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা। প্রবা ফটো
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে বিদেশি গণমাধ্যম। তাদের মধ্যে কার কেমন ভূমিকা ছিল তা নিয়ে বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বিশেষ বক্তৃতার আয়োজন করে গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পরিবার। বক্তৃতায় অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল।
‘বিশ্ব গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তান ডা. নুজহাত চৌধুরী, গ্লোবাল টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা।
কাবেরী গায়েন বলেন, একটি যুদ্ধের ক্ষেত্রে কয়েকটি পক্ষ এক সঙ্গে কাজ করে। কেউ পক্ষে আবার কেউ বিপক্ষে। তবে গণমাধ্যম কোন পক্ষ নিচ্ছে সেটি পরবর্তীতে বড় একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম। শুরু থেকেই বিদেশি সাংবাদিকরা পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসলীলা, নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নিপীড়নের বর্বরতার কাহিনি খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস, টাইমস লন্ডন, দ্য গার্ডিয়ান, দি অবজারভারসহ বেশ কিছু পত্রিকা সে সময় ৩০ থেকে ৪০টি করে সম্পাদকীয় ছাপিয়েছিল। তবে তৎকালীন নিউ ইয়র্ক টাইমস ও টাইমস লন্ডনে ছাপানো সংবাদগুলো নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের প্রকাশিত প্রায় অর্ধেক সংবাদের ভাবার্থ ছিল নিরপেক্ষতা।
তিনি বলেন, ‘ভারতের গণমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিল। দুঃখের বিষয় এসব নিয়ে আমাদের গবেষণা নেই বললেই চলে। এদিকে পাকিস্তানিদের গবেষণামতে মুক্তিযুদ্ধ উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। ভারতীয়রা একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ করছিল। সে সময়কার গণহত্যা এবং নিপীড়নের ফটোগ্রাফগুলোকে পাকিস্তানি গবেষকরা অস্বীকার করতে পারেননি।’
দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা সীমিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে অল্প কয়টা গবেষণা আছে সেখান থেকে দেখা যায়, যুদ্ধের শুরুর দিকে আমেরিকা ও লন্ডনের টিভি-সংবাদপত্রে পাকিস্তানি আর্মিদের আধিপত্যকে বড় করে দেখানো হয়েছিল। বেশ কিছু গণমাধ্যম শুরুর দিকটায় ‘গৃহযুদ্ধ’ আখ্যা দিলেও এপ্রিলে এসে তারা 'গণহত্যা' শব্দ ব্যবহার শুরু করে। যুদ্ধচলাকালে এবং যুদ্ধপরবর্তী বিদেশি গণমাধ্যমের এসব খবর ও ফুটেজ আমাদের গণহত্যার স্বীকৃতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রমাণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব গণমাধ্যমে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ ব্যাপারটা যেভাবে ছড়িয়েছিল তার চেয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ করে জয়ের ব্যাপারটা বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে দেওয়াটা বেশি জরুরি এবং দেশীয় গণমাধ্যমের জন্য এটা গুরুদায়িত্ব।
বিদেশি মিডিয়া প্রসঙ্গে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘নিজেদের দেশে নিজেরাই এখনও অবহেলিত। বাইরের মিডিয়ার কথা তো আসবে পরে। বর্তমানে ১৪ এবং ১৬ ডিসেম্বরের জন্য তড়িঘড়ি করে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সাথে কথা বলে আমাদের সাংবাদিকরা রিপোর্ট প্রকাশ করে ফেলেন। এভাবে এ কাজে অবহেলা, অনাগ্রহ থেকে দেশে ভালো কোনো রিপোর্ট কিংবা গবেষণা আসছে না।’
সাংবাদিক হারুন হাবীব বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে শহীদ হন অনেক সাংবাদিক। তার পরও অবরুদ্ধ সময়ে জীবন বাজি রেখে অনেক বিদেশি সাংবাদিক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন, প্রকাশ করেছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সেসব প্রতিবেদন, আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ কেবল বাংলাদেশের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেনি, সময়ের পরিক্রমায় তা হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল।
২৫ মার্চ বন্দুকের মুখে যখন প্রায় ২০০ বিদেশি সাংবাদিকদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটক করা হচ্ছিল তখন সাইমন ড্রিং ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আলোকচিত্রী মাইকেল লরেন্ট হোটেলের ছাদে আশ্রয় নিয়ে তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের হাত থেকে রেহাই পান এবং দুই দিন তারা অগ্নিদগ্ধ শহরের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষক্ষ করেন—বক্তৃতায় এ বিষয়টি উল্লেখ করেন হারুন হাবীব।
তিনি আরও বলেন, সে সময় পত্রিকা বের করা খুবই কঠিন ছিল। সে কারণে দেশি সংবাদমাধ্যম বাধা পেলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৭০টি প্রান্তীয় পত্রিকা বের হয়েছিল সে সময়। মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানিদের উজ্জীবিত হতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল এ পত্রিকাগুলো।
জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক তার বক্তৃতায় বলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধকে যেভাবে মার্কিন গণমাধ্যম কাভার করেছিল, এখন পর্যন্ত যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেভাবে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা নিয়ে দেশীয় এবং বিদেশি গণমাধ্যমে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। এটা দুঃখজনক। আমরা কেন জানি ফর্মালিটিজে ঢুকে যাচ্ছি। নির্দিষ্ট দিবস পালনে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। এ থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্কাইভে অনেক তথ্য আছে। চাইলে সংবাদকর্মীরা এখান থেকেও গবেষণাধর্মী রিপোর্ট তৈরি করতে পারেন।