প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ২০:১৯ পিএম
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ২০:৩০ পিএম
রাজধানীর গুলশানের বাসিন্দা জুঁই আক্তার। সম্প্রতি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মালদ্বীপ যাওয়ার জন্য ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান ট্রিপকার্ডের সঙ্গে ফেসুবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম মূল্যে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেখে আকৃষ্ট হন তিনি। এরপর ভিসা ও অন্যান্য খরচের জন্য ৫৫ হাজার টাকা দেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার কিছু দিন পরই দেখতে পান ট্রিপকার্ড অফিস বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, অফিস ছেড়ে চলে গেছে তারা। নানাভাবে চেষ্টা করেও আর যোগাযোগ করতে পারেননি।
রাজধানীর বনানীতে এক ভুক্তভোগী সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কক্সবাজারসহ মালদ্বীপ, শ্রীলংকার, থাইল্যান্ডে ট্যুর প্যাকেজের বিভিন্ন লোভনীয় অফার দেখতে পান। কম টাকায় বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার জন্য তিন বন্ধু মিলে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও দুবাই যাওয়ার জন্য বুকিং দেন। তারা কয়েক দফায় ব্যাংকে ও নগদে প্রায় তিন লাখ টাকা জমা দেন। বিদেশ যাওয়া হয়নি তাদের। টাকা চেয়ে যোগাযোগ করলে ট্রিপকার্ডের মালিক বাদীকে হত্যার হুমকি দেন।
প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে বনানী থানায় মামলা করেন ওই ভুক্তভোগী। শুধু এই দুইজন নয়, গত ছয় মাসে এভাবে শতাধিক পর্যটক ঠকেছেন এ চক্রের খপ্পরে। এরা বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন নামে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে লোভনীয় অফার দিয়ে আসতো। চক্রটি এভাবে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি করেছেন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দারা বলছেন, চক্রটি বিভিন্ন নামে ওয়েবসাইট খুলে বিজ্ঞাপন দিত। মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য অভিজাত এলাকা গুলশান, বারিধারা, ধানমন্ডি এলাকায় অফিস ভাড়া করত। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রতারকরা ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। এক এলাকায় অফিস খুলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দেয় এবং কিছুদিন পরে অন্য এলাকায় অফিস খোলে।
মামলার তদন্তে নেমে পর্যটকদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণায় জড়িত চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহনাগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগ। তারা হলেন চক্রের মূল হোতা ও ট্রিপকার্ডের মালিক সাইফুল আলম ওরফে অপু ও তার আপন ভাই মো. আহাদ আলম ওরফে তালহা ও প্রতিষ্ঠানের কথিত এডমিন মো. আমিনুল ইসলাম। তাদের কাছ একটি ল্যাপটপ, ১৪টি পাসপোর্ট, ১০টি মোবাইল ফোন, ১৫টি সিমকার্ড, দুটি ল্যান্ড ফোন, একটি ওয়াকিটকি সেট, একটি সিপিইউ ডেস্কটপ, পাঁচটি এটিএম কার্ড, ছয়টি ব্যাংক চেক উদ্ধার করে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৫ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে ডিবি প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন আর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রতারকরা একসঙ্গে ৪০ জনের ভিসা ও বিমানের টিকেটসহ সকল দায়িত্ব নিজেরাই পালন করার আশ্বাস দেয়। ফলে কম টাকায় সকল সুবিধা দেওয়া সম্ভব বলে ঘোষণা দেয়। অপুর নেতৃত্বে চক্রটি গত ছয় মাসে ৫৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। গোয়েন্দারা ট্রিপকার্ড নামের ওয়েবসাইটের ড্যাশবোর্ডের তথ্যে গত ছয় মাসে শতাধিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণার তথ্য পেয়েছেন।
গোয়েন্দাপ্রধান বলেন, যেকোনো ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেইজে পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। আকর্ষণীয় ও কম মূল্যের বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে, বৈধ লাইসেন্সধারী ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সেবা নিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে থানায় মামলা বা অভিযোগ দিতে হবে। এছাড়া পাসপোর্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের টিম ইনচার্জ এডিসি আশরাফউল্লাহ বলেন, ভ্রমণ খরচের নির্ধারিত টাকার ৪০ শতাংশ অ্যাডভান্স নেয় চক্রটি। বুকিং মানি প্রতারকরা নির্ধারিত ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করে। পরে অফিসে ডেকে ট্যুর প্যাকেজের সম্পূর্ণ টাকা নিয়ে নেয়। মাস দুয়েক পর মোবাইল নম্বর বন্ধ করে অফিস পরিবর্তন করে নতুন ঠিকানায় অফিস নেয় এবং অন্য কোন নামে ফেসবুকে পেইজ খোলে; ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রতারণা শুরু করে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চক্রটি এ পর্যন্ত বিভিন্ন নামে ২৬টি ওয়েজসাইট খুলে পর্যটকদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণা করেছে বলে তাদের তদন্তে উঠে এসেছে।