প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২১:২০ পিএম
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২২:২৪ পিএম
শিশু জুনায়েদ মোল্লা। প্রবা ফটো
টানা ১৪টি নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক শিশুর বিমানে ওঠার ঘটনায় ১০ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কোনো পাসপোর্ট, টিকিট, বোর্ডিং পাস ছাড়া জুনায়েদ মোল্লা নামে এই শিশু কীভাবে বিমানে উঠল তার সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না কারও কাছেই। কর্তৃপক্ষ কয়েকজনের দায়িত্বে গাফিলতির কথা বলেই দায় সারতে চাইছে।
গাফিলতির অভিযোগে বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) যে ১০ জনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (অ্যাভসেক), কুয়েত এয়ারওয়েজ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস) প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এ তথ্য জানান।
এদিকে শিশু জুনায়েদ মোল্লাকে তার পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার বরইহাটি গ্রামের বাঁশবাড়িয়ায় তার বাড়ি। বাবার নাম ইমরান মোল্লা, মায়ের নাম জেসমিন আক্তার। উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে আনার পর তাকে বিমানবন্দর থাকা হেফাজতে রাখা হয়। শিশুটিকে তার চাচা ইউসুফ মোল্লার জিম্মায় দেওয়া হয়। শিশুটি কীভাবে ঢাকায় এসে বিমানে উঠেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি তার চাচা।
শিশুটির চাচা ইউসুফ মোল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিমানবন্দর থানার ওসি আজিজুল হক মিয়া জানিয়েছেন, শিশুটি সপ্তাহখানেক আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর সে কোথায় ছিল কীভাবে ঢাকায় এসেছে, পরিবারের সদস্যরা তার কিছুই জানেন না। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাননি। এর আগেও জুনায়েদ বেশ কয়েকবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। দেড় মাস আগে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে ফরিদপুরে চলে যায়। সেখানকার এক ব্যক্তি তাকে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের জানান। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা ওই ছেলেকে নিতে আসার আগেই সে আবার পালিয়ে যায়। এভাবে কিছু দিন পরপরই জুনায়েদ বাড়ি থেকে পালায় বলে ওসিকে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
বেবিচক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান বলেন, ’এ ঘটনায় যাদের গাফিলতি ছিল প্রত্যেককে মঙ্গলবারই সাসপেন্ড (প্রত্যাহার) করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ জনকে চিহ্নিত করে বুধবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা ইমিগ্রেশন পুলিশ, অ্যাভসেক, কুয়েত এয়ারওয়েজ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলার। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটি তাদের প্রতিবেদনে পুরো ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবে। এরপর যাদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিধি অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এর আগে সোমবার মধ্যরাতে কুয়েত এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে জুনায়েদ মোল্লা নামের শিশুটি নিরাাপত্তা ভেদ করে বিমানে উঠে যায়। এ ঘটনায় বিমানবন্দরে তোলপাড় শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
বিমানবন্দরে যাত্রীরা বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত প্রত্যেক কর্মী ডিউটি পাস ব্যবহার করে চলাফেরা করেন। বাকি যারা যাত্রী তারা পাসপোর্ট ও বোর্ডিং পাস দিয়ে চলাফেরা করেন। এ ছাড়া বিমানবন্দরে ঢুকে ইমিগ্রেশনসহ ১৪টি ধাপ পেরিয়ে প্লেনে চড়তে হয়।
কোনো ধাপেও শিশুটিকে না আটকানোর বিষয়টি নিরাপত্তাহীনতা বলে মন্তব্য করেছেন অনেক যাত্রী।
বিমানবন্দর থানা-পুলিশ জানায়, আমরা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখছি শিশুটি কীভাবে বিমানবন্দরে প্রবেশ করেছিল এবং ফ্লাইটে উঠেছিল। আমরা দেখতে পাই, ইমিগ্রেশন, অ্যাভসেক তল্লাশি ও সিকিউরিটি চেক না করায় শিশুটি নির্বিঘ্নে ফ্লাইটে উঠে যাচ্ছে। এটি দেখে অবাক হয়ে পড়েন সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটটি এয়ারপোর্ট ত্যাগ করার মাত্র ১০ ঘণ্টা পর বিমানবন্দরের এমন চিত্র পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। তারা বলছেন, অজপাড়াগাঁয়ের একটি শিশুর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় বিমানবন্দরের এত গেট ডিঙিয়ে ফ্লাইটে ওঠা। কেউ না কেউ তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছে। কিংবা পুরো ঘটনাটি সুপরিকল্পিতও হতে পারে।
বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, কুয়েত এয়ারওয়েজের ফ্লাইটটি যখন ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সে সময় জুনায়েদ প্লেনের ভেতরে করিডোরে হাঁটাচলা করছিল। কেবিন ক্রু শিশুটিকে সিটে বসার পরামর্শ দেন। তখন শিশুটি একটি সিটে বসে পড়ে। একপর্যায়ে শিশুটি যেই সিটে বসেছিল পাশের সিটের যাত্রী শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে বসতে বলে। কিন্তু শিশুটি তার বাবা-মায়ের বিষয়ে কোনো কিছু বলতে পারেনি। পাশের সিটের যাত্রী বিষয়টি কেবিন ক্রুর নজরে আনলে কেবিন ক্রু তাকে বাবা-মার বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। তবে শিশুটি উত্তর দিতে পারেনি। একপর্যায়ে কেবিন ক্রুরা যাত্রীসংখ্যা গণনা করেন। তখন একজন যাত্রী বেশি পাওয়া যায়। এতেই তোলপাড় শুরু হয় বিমানবন্দরে।