বিটিআই জালিয়াতি
ফয়সাল খান
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২২:১৭ পিএম
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২২:২৯ পিএম
বিটিআই জালিয়াতিতে চীনা নাগরিকের পরিচয়ও ভূয়া বলে জানা গেছে। প্রবা ফটো
ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিশ মশার প্রকোপ সামাল দিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে সিঙ্গাপুর থেকে জৈব কীটনাশক বা বিটিআই আমদানির প্রতিটি ধাপে বেরিয়ে আসছে একের পর এক জালিয়াতির তথ্য। সিঙ্গাপুরের যে প্রতিষ্ঠান থেকে এই পণ্য এনেছেন বলে দাবি করেছিলেন আমদানিকারক, সেই প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে জানিয়েছে বাংলাদেশে আনা বিটিআই তাদের উৎপাদিত নয়। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বিটিআই বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে লি শিয়াং নামের যে চীনা নাগরিকের মাধ্যমে এ পণ্য আমদানি করা হয়েছে তার সঙ্গে কোনও সম্পর্কও নেই বলে দাবি করেছে সিঙ্গাপুরের ওই প্রতিষ্ঠান।
এ ঘটনায় চীনের ওই নাগরিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিটিআই আমদানির কাগজপত্রে চীনের ওই নাগরিকের সঠিক নাম পর্যন্ত ব্যবহার হয়নি। তার নাম-পরিচয় নিয়েও ছলচাতুরির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্টিজ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই বিটিআই আমদানি করা হয়েছে। আমদানিকারকের দাবি, সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিকেল কোম্পানি থেকে বিটিআই আনা হয়েছে। তবে বেস্ট কেমিলের দাবি, ডিএনসিসির আনা বিটিআই তাদের নয়।
গত ৭ আগষ্ট রাজধানীতে বিটিআই প্রয়োগ কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় চীনা নাগরিক লি শিয়াংকে বেস্ট কেমিকেলের বিক্রয় ব্যবস্থাপন ও বিটিআই বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বেস্ট কেমিকেল লি শিয়াংয়ের ছবি দেখে দাবি করেছে, এই ব্যাক্তির সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানের কোনও সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ সরকারকে ওই চীনা নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের আহ্বানও জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু তা না করেই লি শিয়াংয়ের নামের গুলশান থানায় মামলা করেছে ডিএনসিসি।
কে এই ‘বিটিআই বিশেষজ্ঞ’
লি শিয়াং নামের ওই ব্যাক্তির ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে তার ফেসবুক প্রোফাইল ও ইমেইলের ঠিকানা সংগ্রহ করেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ। চীনের ওই ব্যাক্তির ফেসবুক প্রোফাইলে নাম তার লেখা জনি লি। ২০১৪ সালে ওই প্রফোইলে জনি লির একটি ভিজিটিং কার্ড পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে তার পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে চীনের শানডং কিয়াওচ্যাং ক্যামিক্যাল কোম্পানী লিমিটেডের বিক্রয় ব্যবস্থাপক হিসাবে। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লি শিয়াং ওরফে জনি লি আগেও বহুবার বাংলাদেশ ও ভারত সফর করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার ছবি রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জনি লিকে ইমেইল পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। বিটিআই আমদানিকারক মার্শাল অ্যাগ্রোভেটের কাছেও হএ ব্যাপারে কোনও বক্তব্য মেলেনি। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে গত ২১ আগস্ট রাতে গুলশান থানায় ডিএনসিসির মামলায় চীনা নাগরিকের নাম লি শিয়াং লেখা হয়েছে। মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকে তার কোনও খোঁজ নেই। তিনি কোথায় আছেন সে বিষয়ে তথ্য নেই পুলিশের কাছেও।
চীনা নাগরিকের নাম বিভ্রাটের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ শাহানূর রহমান গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। তবে চার নম্বর আসামি চীনা নাগরিক সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি। তার পাসপোর্ট নাম্বার না পাওয়ায় তিনি দেশে আছেন নাকি চলে গেছেন তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। মামলায় তার নাম ভুল হলে পরে সংশোধন করে নেওয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। কোথায় কি হয়েছে তদন্ত শেষ হলে তা বলতে পারব।
এদিকে গুলশান থানায় ডিএনসিসির করা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন মার্শাল অ্যাগ্রোভেটের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলাউদ্দিন এবং নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ। গুলশান থানার একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তদন্তে আরও সময় চায় ডিএনসিসি
গত ১৮ আগস্ট বিটিআই জালিয়াতির ঘটনায় ডিএনসিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শরীফ উদ্দীনকে প্রধান করে গঠন করা ৩ সদস্যের ওই কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি বরং আরও এক সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেছে কমিটি। সময় বাড়নোর আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
এদিকে এ ঘটনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি মামলা হয়েছে। ডিএনসিসি মার্শাল অ্যাগ্রোভেটকে কালো তালিকাভূক্ত করেছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জড়িত তিনজনকে কারন দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।