প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১৯:১৬ পিএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩ ২০:২১ পিএম
জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাপার ‘বৃক্ষ নিধন ও তার পরিবেশগত প্রভাব : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় আলোচকরা। প্রবা ফটো
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, দেশে একের পর এক গাছ কাটা হচ্ছে। বন হচ্ছে উজাড়। ধ্বংস করা হচ্ছে উদ্যান। এসব কিছুর পেছনে শুধু উন্নয়নের কথা টেনে আনা হয়। উন্নয়ন মানেই গাছের গর্দান কাটা, উপড়েফেলা এটা কি করে হতে পারে? অথচ গাছ না থাকলে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব থাকবে না। তাই দেশে কোথায় কোন গাছ কাটা হবে, কোথায় রোপণ করা হবে সে ব্যাপারে মহাপরিকল্পনা থাকা দরকার।
শনিবার (৮ জুলাই) রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বৃক্ষ নিধন ও তার পরিবেশগত প্রভাব : আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
বাপার কোষাধ্যক্ষ মহিদুল হক খানের সভাপতিত্বে ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব। আলোচনায় অংশ নেন ধানমন্ডির সাত মসজিদ সড়ক গাছ রক্ষা আন্দোলনের নেতা শিরিন হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক, অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা, গ্রীন সেভার্সের প্রধান নির্বাহী আহসান রনি প্রমূখ।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বৃক্ষ নিধন রোধে ২০১৬ সালের বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন এখনও কার্যকর হয়নি শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। সরকার যখন উন্নয়নের পরিকল্পনা করে, তখন তা জনগণকে জানতে দেয় না। সাত মসজিদ সড়কের ১৫-৩০ বছর বয়সী গাছ কেটে তার জায়গায় বাগানবিলাশ গাছ লাগিয়ে ধানমন্ডিবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। গাছ কাটার পেছনে আর্থিক বাণিজ্য কাজ করছে। জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করে এমন গাছ রোপণ, সংরক্ষণ এবং মাদার ট্রি বা বড় গাছ রক্ষার আইন চাই।
মূল প্রবন্ধে ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশেই উন্নয়নের নামে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ নিধন চলছে। রাস্তার সংস্কার, বৃদ্ধি, নতুন রাস্তা তৈরি কিংবা রামপাল তাপবিদুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পের নামে দেশব্যাপী বৃক্ষ নিধনের মহোৎসব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রাস্তাটি সম্প্রসারণের প্রকল্পটি ২০১৭ সালের মার্চ মাসে পাশ হয়। এই রাস্তার দুই পাশে সড়ক ও জনপথের হিসেব অনুযায়ী গাছ রয়েছে ২ হাজার ৩১২টি। এর মধ্যে এই মহাসড়কটি ঐতিহাসিকভাবে যশোর থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। যশোর রোডের ভারতীয় অংশের ৩০৬টি শতাব্দীপ্রাচীন গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ১৫০০টি বৃক্ষ রোপণের শর্তে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে বাংলাদেশের যশোর পর্যন্ত, ঐতিহাসিক মহাসড়কের ওই গাছগুলো কাটার অনুমতি দেয়া হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের গবেষণা অনুসারে, ঢাকা মহানগরে ২০ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন অথচ আছে সাড়ে ৮ শতাংশের কম।
মহিদুল হক খান বলেন, উন্নয়নের নামে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে গাছ কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। জীববৈচিত্র রক্ষা উপযোগী বৃক্ষ রোপণ করা প্রয়োজন। তা না হলে জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে। ঢাকার সড়কগুলো প্রশস্তের নামে রাস্তার গাছগুলো কাটা হচ্ছে অথচ রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন সবুজে ঘেরা একটি শহরে পরিণত হয়েছে শুধুই মানসিকতা পরিকল্পার তারতম্যের কারণে।
শিরিন হক বলেন, রাতের অন্ধকারে চোরের মতো সিটি কর্পোরেশনের অনুমতিতে সাতমসজিদ সড়কের ৬০০টি গাছ কাটা হয়েছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, ঢাকার মধ্যে সবুজে ঘেরা ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের তুলনায় অন্যান্য স্থানের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির বেশী তারতম্য লক্ষ করা যায়। দেশের স্কুলগুলোতে পরিবেশ বিষয়ে ছোট বাচ্চাদের গাছ ও পরিবেশের প্রতি সহনশীলকরে তোলার জন্য হাতে কলমে বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
সভায় বৃক্ষ নিধন বন্ধে ৩টি প্রস্তাবনা এবং ১২টি দাবি তুলে ধরা হয়।
প্রস্তাবনাগুলো হলো
১. বৃক্ষশুমারী; নগর এলাকাসমূহের পাশাপাশি সকল সড়ক ও মহাসড়কে বৃক্ষশুমারী পরিচালনা এবং বৃক্ষ সংক্রান্ত ডাটাবেজ প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বা কর্মকাণ্ডের অজুহাতে বৃক্ষ কর্তন নিয়ন্ত্রণ করা।
২. নগর সবুজায়ন নীতিমালা ও কৌশলপত্র প্রণয়ন; পরিকল্পিত বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে নগর সবুজায়ন, যথাস্থানে যথোপযুক্ত বৃক্ষ রোপণ, হিট আইল্যান্ড এফেক্ট প্রতিরোধ এবং বৃক্ষ কর্তন রোধকল্পে নগর সবুজায়ন নীতিমালা ও কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে যা নগর সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে।
৩. ফুটপাথ পুনঃবিন্যাস, বৃক্ষ সংরক্ষণ ও রোপণ; যে কোন সড়কে, পুরো পথচারী চলার পথটি ২ ভাগে বিভক্ত করা যায়: প্রথমত- ফুটপাত: এখানে, ফুটপাত হল ৩-মিটার প্রশস্ত নিরবচ্ছিন্ন লেন। ফুটপাতের নিচে একটি সাধারণ ইউটিলিটি ডাক্ট স্থাপন করা হবে।
দ্বিতীয়ত- সাইডওয়াক: সাইডওয়াক হল প্রায় ২ মিটার চওড়া, তারমধ্যে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ-সুবিধা রাখতে হবে।
দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে
পরিকল্পনাহীনভাবে সড়কদ্বীপে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে; স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষ দ্বারা ইতোমধ্যে কেটে ফেলা গাছ প্রতিস্থাপন করতে হবে; রোপণকৃত গাছের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। উপযুক্ত বৃক্ষশুমারীর মাধ্যমে বিদ্যমান বৃক্ষের সংরক্ষণ ও নতুন বৃক্ষ রোপণের কৌশল নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে ইত্যাদি।