তারা বলছে, সারা দেশের উন্নয়নের মধ্যে যেমন আঞ্চলিক বৈষম্য আছে, তেমনি ঢাকার ভেতরেই উন্নয়নের মধ্যে এলাকাভিত্তিক বৈষম্য দৃশ্যমান। ঢাকার নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোতে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত না করা গেলে এই এলাকাসমূহ ক্রমান্বয়ে অবাসযোগ্য হয়ে পড়বে।
শনিবার (২৪ জুন) আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়।
আইপিডি বলছে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে আমরা বিগত সময়ে বড় ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছি নগর সুশাসন, সেবা সংস্থাসমুহের
পারস্পরিক যোগাযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের কার্যকর সমন্বয়, সেবা সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, উন্নয়ন পরিকল্পনায় কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোতে।
একই সঙ্গে নাগরিক পরিষেবা ও পার্ক-খেলার মাঠসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার প্রবেশগম্যতা, নগরের উন্নয়নে এলাকাভিত্তিক সাম্যতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রভৃতি বিষয়গুলোকে প্রাধান্য না দিলে ঢাকার বাসযোগ্যতার তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
পাশাপাশি ঢাকার যানজট এবং বায়ু, পানিসহ পরিবেশদূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাশ্রয়ী, কার্যকর ও টেকসই সমাধান বের না করতে পারলে ঢাকা বাসযোগ্য হবে না বলে মনে করে আইপিডি।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে পার্ক-খেলার মাঠের উন্নয়ন করা হয়েছে, খাল-জলাশয় উদ্ধার করার প্রয়াস ও চলমান আছে; এ উদ্যোগসমুহ সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এখনও ঢাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে, গাছ কেটে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে; পুকুর-জলাশয়-জলাভূমি ভরাট করে উন্নয়ন চলছেই, যার সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সম্পৃক্ততাও পাওয়া যাচ্ছে। আবার ঢাকায় বাণিজ্যিক ও শিল্প-কারখানার লাগাম টানা যাচ্ছে না; জলাশয়-জলাধার দখল ও মাটি-পানি-বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বস্তুত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাসহ সকল পরিকল্পনা ও আইনের কার্যকর নজরদারি ও বাস্তবায়নের অভাব এবং নগর সংস্থাসমুহের নজরদারি ও জবাবদিহি না থাকায় ঢাকার বাসযোগ্যতার প্রকৃত উন্নতি হচ্ছে না।
আইপিডি মনে করে, ঢাকার অবাসযোগ্যতার পেছনে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা ও জনঘনত্বের দায় আছে, এটা অনেকাংশে সত্য। তবে ঢাকায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চল থেকে ঢাকামুখী অভিগমনের হার কেন কমানো যাচ্ছে না, আমাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অনুসৃত বিকেন্দ্রীকরণ নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন কেন এতদিনেও করা গেল না, সেই উত্তর নীতি-নির্ধারকদেরকেই দিতে হবে।
আইপিডি বিশ্বাস করে, অবকাঠামোকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন মডেলের পরিবর্তন করে বাসযোগ্যতা, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিতাকে প্রাধান্য দিয়ে ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো দরকার। সকল ধরনের নাগরিক পরিষেবা এবং সুযোগ-সুবিধার সহজলভ্যতা ও অন্তর্ভুক্তিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন; একই সাথে নগর সংস্থাসমুহের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো দরকার। উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে নাগরিকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে নগরের বাসযোগ্যতা বাড়বে।
একই সঙ্গে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের জন্য সঠিক পরিকল্পনা কৌশল প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন না করা গেলে ঢাকায় যতই অবকাঠামো তৈরি ও উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ দেয়া হোকনা কেন, ঢাকার বাসযোগ্যতার তেমন একটা উন্নতি হবে না বলে মনে করে আইপিডি।
ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৩ এর বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩ দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৬৬তম, যা গত বছরের মতো নিচের দিক হতে সপ্তম। এই অবস্থান থেকে আমরা উন্নতি না করতে পারলে ঢাকায় বসবাস করা দেড় কোটি মানুষ, যারা আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশ এবং তাদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন অর্জিত হবে না।