ফয়সাল খান
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৩ ১০:০১ এএম
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কোরবানির পশু আসছে রাজধানীর হাটগুলোতে। প্রবা ফটো
রাজধানীর কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাটগুলোতে আনুষ্ঠানিক বেচাকেনা শুরু হবে আগামীকাল রবিবার থেকে। তবে এরই মধ্যে হাটগুলো কোরবানির পশুতে ভরে উঠেছে।
দেশের বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলা এবং গ্রাম পর্যায়ের হাটগুলোতেও কোরবানির পশু বেচাকেনা শুরু হয়েছে। এবার কোরবানির চাহিদার চেয়ে দেশে ২১ লাখ পশু বেশি রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সে হিসেবে কোরবানির পশুর কোনো সংকট হওয়ার কথা নয়।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, পশুতে হাটগুলো প্রায় ভরে গেছে। ছোট, বড় ও মাঝারি এবং দেশি-বিদেশি সব ধরনের গরুই উঠেছে। তবে অস্থায়ী হাটগুলোতে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা এখনও ওঠেনি। কয়েকটি হাটে মহিষ দেখা গেছে। টুকটাক বেচাকেনাও চলছে। তবে বেচাকেনা জমে উঠতে আরও দুই-তিন দিন সময় লাগবে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখনও ট্রাকে ট্রাকে গরু নিয়ে আসছেন খামারিরা। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিসহ আনুষঙ্গিক কাজ এখনও চলছে। এখন ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি।
গতকাল কাওলার শিয়ালডাঙ্গা হাট ঘুরে দেখা গেছে, এখনও গরু রাখার শেড তৈরির কাজ করছেন কর্মীরা। ডিজিটাল লেনদেনের বুথ স্থাপনের কাজও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু নিয়ে এসেছেন। অনেকেই গরু রাখার জায়গা প্রস্তুত করছেন। কেউ কেউ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
ক্রেতার জন্য অপেক্ষা
যাত্রাবাড়ীর দনিয়া হাটে কাজলা থেকে তিন দিন আগে ২৫টি গরু নিয়ে এসেছেন সাজন হাওলাদার। গরুগুলো মোস্তফা এন্টারপ্রাইজ ফার্মের। ১ নম্বর কাউন্টারের সামনে বাঁধা কালাপাহাড় নামে গরুটি এই হাটের সবচেয়ে বড় গরু হিসেবে দাবি করেছেন সাজন। গরুটি দেখতে অনেক ক্রেতা ভিড় করেন।
সাজন জানান, প্রায় ১৯ মণ ওজনের এই গরুটির দাম হাঁকা হচ্ছে ১৮ লাখ টাকা। এক ক্রেতা ৮ লাখ টাকা বলেছেন। কালাপাহাড় নামে এই গরুটি দেখার জন্য প্রতিনিয়ত ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। মালিক যা বলছেন, কালাপাহাড় তা-ই করছে। তার মালিক জানান, কালো রঙের ও ‘পাহাড়ের মতো’ উঁচু হাওয়ায় এর নাম রাখা হয়েছে কালাপাহাড়।

শ্যামপুরের শ্মশানঘাট কোরবানির পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এই হাটটিতে প্রচুর গরুর উঠেছে। এখানেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য দেওয়া হয়েছে অনেক সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি। যদিও চোখে পড়েনি পশুর ডাক্তার ও জালটাকা শনাক্তকরণ মেশিনসহ অনেক কিছু।
এই হাটে কথা হয় পাবনা থেকে চার দিন আগে বিশাল গরু নিয়ে আসা সোলায়মানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ছয়টি গরু নিয়ে আসছি। এর মধ্যে কালাচান নামক গরুটি এই হাটের সেরা গরু। যার ওজন প্রায় ১৮ মণ। গরুটি কালো বর্ণের হওয়ায় এর নাম দেওয়া হয়েছে কালাচান। এইগুলো আমাদের পালিত গরু। ক্রেতারা যে দাম বলছেন তাতে বিক্রি করা সম্ভব নয়। কারণ, গরুর খাবারের দাম অনেক বেড়েছে।
শ্মশানঘাট হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য নূর মোহাম্মদ টিপু বলেন, এই হাটের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার জন্য সব রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের কৃষকদের পালিত গরু এই হাটে আসে। প্রতি বছরের মতো এবারও বেচাকেনা ভালো হবে বলে তার আশা।

মেরাদিয়া হাটে গিয়ে দেখা গেছে, পশুতে ভর্তি হাট। তবে এই হাট বনশ্রী এইচ ব্লক, এভিনিউ সড়ক, জে, কে, এল, এম ও এন ব্লকের সব সড়কে বসেছে। বাসাবাড়ি, রাস্তা, ফুটপাত, দোকান, হাসপাতাল, মসজিদের আশপাশে, সামনে ও পেছনে সর্বত্রই বেঁধে রাখা হয়েছে গরু-ছাগল। আবাসিক এলাকার রাস্তার উভয় পাশে সারি সারি বাড়ি। এসব ভবনের সামনে গরু বেঁধে রাখতে দেখা যায়। যেসব গলিতে পশু রাখা হয়েছে সেসব গলিতে চলাচল করা যাচ্ছে না। আর মাইকে সারা দিনই চলছে উচ্চশব্দে পশু বিক্রির ঘোষণা।
ওই এলাকার কুদ্দুস মিয়া বলেন, প্রতি বছর বাসাবাড়ির সামনেই গরুর হাট বসায়। গরুর গোবর আর হাটের ময়লা-আবর্জনার কারণে বাসায় প্রবেশ এবং বের হওয়া রীতিমতো কষ্টকর।
বনশ্রীর এইচ ব্লকের বাসিন্দা মো. জারীফ জাওয়াদ বলেন, আমার বাসার দরজায় গরু বাঁধা। গাড়ি বের করতে পারি না। রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। সারা দিন মাইকে পশু বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। আফতাবনগর হাটও পশুতে ভর্তি। একই অবস্থা আমুলিয়া, সারুলিয়া তেজগাঁও পলিটেকনিক মাঠ, সাঈদ নগর পশুর হাটেও।

আফতাবনগর পশুর হাটে কুষ্টিয়া থেকে গরু নিয়ে এসেছেন মো. এজাজ। তিনি বলেন, গতকাল রাতে গরু নিয়ে এসেছি। আমার ১২টি গরু রয়েছে। এখনও একটিও বিক্রি হয়নি। তবে মানুষ আসছে, দেখছে, দরদাম করে চলে যাচ্ছে।
এ হাটের ইজারাদার প্রতিনিধি আকাশ জানান, হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার জন্য সব রকম ব্যবস্থা রেখেছেন। ঢাকায় গরু রাখার জায়গা না থাকায় সবাই ঈদের আগের দিন গরু কিনতে চান। তাই এখনও বেচাকেনা জমে ওঠেনি। রবিবার থেকে বেচাকেনার চাপ বাড়বে।
দেশি পশুতে মিটবে কোরবানির চাহিদা
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, এবার কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। দেশি পশুতে কোরবানির চাহিদা মিটবে। দেশে কোরবানি উপযোগী পশু রয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি। যা গত বছরের চেয়ে ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৪৪টি বেশি। আর কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি। চাহিদা ও সরবরাহের হিসাবে এবার দেশে প্রায় ২১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৪টি পশু বেশি রয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী এবারও দেশে কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না।