প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৩৫ পিএম
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মিলনায়তনে শনিবার সকালে মতবিনিময় সভা। ছবি : প্রবা
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে গত দুই বছর জমেনি দুর্গাপূজা। এবার জাঁকজমকের সঙ্গে সারা দেশে ৩২ হাজার ১৬৮ মণ্ডপে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে উৎসাহভরে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিলেও শঙ্কামুক্ত নন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষত অস্থায়ী মন্দিরগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
শনিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় পরিষদের সভাপতি জে এল ভৌমিক এ শঙ্কার কথা জানান।
তিনি বলেন, গত বছরের ঘটনার প্রেক্ষাপটে এ বছর সরকার চাচ্ছে কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো অঘটন না ঘটে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি সক্রিয়। কিন্তু সারা দেশে ৩২ হাজারর ১৬৮টি মন্দিরকে সুরক্ষা দেওয়া খুব কঠিন। তাই এ বছর প্রতিটি মন্দিরে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকরা রাতেও পাহারা দেবেন।
গত বছর দুর্গাপূজার সময় চট্টগ্রামের মন্দিরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়। এর জেরে কুমিল্লা, নোয়াখালী, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ ও রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়।
জে এল ভৌমিক বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ এ কথা বলা যাবে না। তবে আমরা এবার খুব সচেতন। সিসিটিভির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গ্রামে বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সেই মন্দিরগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ যেগুলো অস্থায়ী। স্থায়ী জায়গা না হয়ে মাঠে, ময়দানে বা বিভিন্ন রাস্তাঘাটে যেসব মণ্ডপ স্থাপন করা হয় সেগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে আমাদের বেশি বেশি পাহারা দিতে হবে এবং সারারাত বসে থাকতে হবে।’
সভায় জে এল ভৌমিক আগামী নির্বাচনের আগেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বারবার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইশতেহারে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনের কথা বলা হয়েছে। আগামী নির্বাচনের আগেই এটা করতে হবে।
কেমন আইন চান—সে বিষয়ে তিনি এসিড নিক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘এসিড নিক্ষেপে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে স্পেশাল আইন করায় এটা কমে গেছে। আমাদের জন্যও এমন একটি আইন করতে হবে। যারা অপরাধী তাদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে এবং স্পেশাল আদালতে কম সময়ের মধ্যে বিচার করতে হবে।’
আগামীকাল ২৫ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে পিতৃপক্ষের সমাপ্তিতে দেবীপক্ষের শুভসূচনায় ধ্বনিত হবে আনন্দময়ীর আগমনী বার্তা। ১ অক্টোবর শনিবার ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ৫ অক্টোবর বুধবার দশমী তিথিতে প্রতিমা নিরঞ্জনে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা।
করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর উৎসব-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করে সাত্ত্বিক পূজায় সীমাবদ্ধ রাখতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
মতবিনিময় সভায় পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক চন্দ্রনাথ পোদ্দার লিখিত বক্তব্যে জানান, গত বছর সারা দেশে দুর্গাপূজায় মণ্ডপ ছিল ৩২ হাজার ১১৮টি। এবার এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৬৮টিতে, যা গত বছরের চাইতে ৫০টি বেশি। ঢাকা মহানগরে পূজা হবে ২৪১টি, যা গত বছরের থেকে ছয়টি বেশি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে পূজার সংখ্যা বাড়ছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শুভানুধ্যায়ীদের অনুদান নিঃসন্দেহে পূজার সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি নিশ্চয়ই আনন্দদায়ক। তবে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পূজাকেন্দ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সবার বিবেচনায় নেওয়া দরকার
চন্দ্রনাথ বলেন, ‘পূজা, ঈদ, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা প্রতিটি সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। আমরা এমন একটি সমাজের অপেক্ষায় আছি, যেখানে ঈদ-পূজা-বড়দিন-বৌদ্ধ পূর্ণিমাসহ অন্যান্য ধর্মীয় ও সার্বজনীন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্নে, অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে, কোনোরকমের ভয়ভীতি এবং পুলিশি পাহারা ব্যতিরেকে অনুষ্ঠিত হবে।’
মতবিনিময় সভায় তিনটি বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়: দুর্গাপূজা চলাকালীন কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি না দেওয়া; দুর্গাপূজাসহ অন্যান্য প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা না নেওয়া; দুর্গাপূজাসহ অন্যান্য প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া।
সভা থেকে আরও যেসব দাবি তোলা হয় :
>> হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবি দুর্গাপূজায় দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করা।
>> অন্যান্য জাতীয় উৎসবের মতো দুর্গাপূজাও জাতীয় মর্যাদায় পালনের পদক্ষেপ নেওয়া।
>> কারাগার, হাসপাতাল, অনাথ আশ্রমে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন।
>> দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি অনুদান পূজা উদযাপন পরিষদের স্থানীয় কমিটির তালিকা অনুযায়ী বণ্টন করা।
>> দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন প্রণয়নে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
>> গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ঘোষিত ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, অর্পিত সম্পত্তি ফেরত প্রদানে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ, দুষ্কৃতকারীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেয়াদে বাস্তবায়ন করা।
>> হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের পরিবর্তে হিন্দু ফাউন্ডেশন গঠন।
>> প্রতিটি জেলায় একটি করে মডেল মন্দির কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা।
>> টোলগুলোর সংস্কার ও টোলের শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ধার্য করা।
>> ২০২১ সালে দুর্গাপূজার সময় সংঘটিত সহিংসতাসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে দেশব্যাপী হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দিরে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনাসমূহের তদন্ত ও দ্রুত বিচার করা।
প্রবা/টিকে/ এসআর