প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৩ ২২:৩৫ পিএম
আপডেট : ০১ জুন ২০২৩ ২২:৫৩ পিএম
নির্যাতিত গৃহকর্মী অঞ্জনা আক্তার। প্রবা ফটো
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে সাত বছর আটকে থাকার পর উদ্ধার হওয়ায় শিশু অঞ্জনা আক্তার পরিবার ফিরে পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ জুন) আদালেতের মাধ্যমে তাকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। এর আগে গত বুধবার ভোরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে ভাটারা থানা পুলিশ।
উদ্ধারের পর অঞ্জনার বলা ঠিকানা খুঁজতে শুরু করে পুলিশ। পরে ভাটারা থানায় কর্মরত ওই এলাকার এক পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়।
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন, ভাটারা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া গৃহকর্মী অঞ্জনার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের সালনা এলাকায়। তবে গ্রামে কেউ থাকে না। তার বাবা আগেই মারা গেছেন। মা অন্যত্র বিয়ে করেছেন। তারা চার ভাইবোন। তার ভাই সুজাত পরিবার নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অঞ্জনার বিষয়টি জানানো হয়।’
অঞ্জনার ভাইয়ের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘২০১৬ সালে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে রেল লাইনের পাশে খালার বাসায় বেড়াতে যায় অঞ্জনা। সেখান থেকে হারিয়ে যায়। পরে সবাই মিলে অনেক খোঁজাখুজি করেও পাইনি। প্রায় ৭ বছর পর বুধবার পুলিশের ফোনে ভাটার থানায় গিয়ে অঞ্জনাকে পাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি শারমিন হোসেন শর্মী ও এরিক মোরশেদ দম্পতি তাকে সাত বছর আটকে রেখে গৃহকর্মীর কাজ করাত। মারধরসহ বিভিন্ন শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করত।’
পুলিশ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রী শারমিন হোসেন শর্মীর বিরুদ্ধে মনোয়ারা বেগম মামলা করছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
কৌতূহলবশত ভৈরব থেকে ট্রেনে উঠেছিল শিশু অঞ্জনা আক্তার। ভেবেছিল ট্রেন ঘুরে এসে নামিয়ে দিবে। চলতে চলতে ট্রেন এক সময় থেমে গেল। অঞ্জনা দেখল নতুন প্লাটফর্ম। নিজেকে আবিষ্কার করল কমলাপুর রেলস্টেশনে। অচেনা-অজানা জায়গায় মন খারাপ করে বসে বসে কান্না করছিল। কান্না দেখে এগিয়ে এসে একজন জানালেন বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। কিছুটা স্বস্তি পায় শিশুটি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! লোকটি তাকে শারমিন হোসেন শর্মীর কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর অমানসিক নির্যাতন নিপীড়নে ওই নারীর রান্না ঘরেই কেটে যায় সাত বছর।
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে অঞ্জনা বলেন, ‘সাত বছর ধরে রান্না ঘরেই আটকে রাখা হয়েছে। এক বেলা খাবার দিলে অন্য বেলা দেওয়া হত না। দিন-রাত কাজ করতে হয়েছে। কাজে ত্রুটি পেলেই কাঁটাচামচ, খুন্তি, রুটি বানোর বেলন কিংবা চাকু দিয়ে আঘাত করা হত। অসুস্থ হলে ওষুধ দিত না। বরং শুয়ে থাকলে মারধর করত। রান্না ঘরের বাইরে বের হতে দিতো না। বাসায় কেউ আসলে আটকে রাখা হতো।’ বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন আর হাত, পা, বাহু, গাল, ঠোঁটে আঘাতের চিহ্নগুলো দেখাচ্ছিলেন। তার পা ফুলে গেছে, বাম হাতে বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দগদগে রক্তাক্ত ক্ষতগুলোই বলে দিচ্ছে নির্যাতনের ভয়াবহতা।
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাড়ির তিন তলার শারমিন হোসেন ও এরিক মোরশেদ দম্পতির ফ্ল্যাটে সাত বছর আটকে রাখা হয় অঞ্জনাকে। বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় পাশের ভবনে থাকা বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সজল শেখের। বিষয়টি বাসার অন্যদের ও বাড়ির মালিককে জানান সজল। পরে গত বুধবার ভোর ৫টায় পড়তে উঠে সজল দেখেন অঞ্জনা তখনও কাজ করছে। তখনই জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এ কল করে অঞ্জনাকে উদ্ধারের অনুরোধ জানান। পরে ভাটারা থানা পুলিশ দুই ঘন্টার চেষ্টায় তাকে উদ্ধার করে।