আনিছুর রহমান
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৩ ১৬:০৩ পিএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৩ ১৬:০৫ পিএম
রাস্তায় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ইট ভাঙার কাজ করছেন দুজন শ্রমিক। আরিফুল আমিন
চল্লিশোর্ধ্ব কবির দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে রাজধানী ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। পেশার নামের সঙ্গে রাজকীয়তার ইঙ্গিত থাকলেও খুবই অভাব-অনটনে চলছে তার জীবন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে পশ্চিম নাখালপাড়ার একটি বাসায় থাকেন। যেখানে ভাড়া দেন সাত হাজার টাকা। ঝালকাঠির রাজাপুরের বাড়িতে মার জন্য পাঠান দুই হাজার টাকা। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একমাত্র তিনিই। দিনে আয় করেন ৭০০ টাকা। সেটাও মাসে ২০-২৫ দিন। ২০ দিন কাজ করলে আয় দাঁড়ায় ১৪ হাজার টাকা। বাসাভাড়া দিয়ে ও মায়ের জন্য টাকা পাঠিয়ে যা থাকে তা দিয়েই চলে বাজার সদাই।
ঊর্ধ্বমুখী এই বাজারে সামান্য টাকা দিয়ে পেরে উঠছেন না তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, ঢাকায় ৪০ টাকা দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। ওই টাকায় তখন যতটা ভালো চলতেন এখন আর তা পারেন না। এখন এক দিন কাজ না করলে উপোস থাকতে হয়।
কবির জানান, ২০২০ সালে বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিল ও কোমরে বেশ চোট পেয়েছিলেন। সেই সময় কেউ তার পাশে দাঁড়াননি। যে বিল্ডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন সেই বিল্ডিংয়ের মালিকও কোনো সহায়তা করেননি। এগিয়ে আসেননি ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশও (ইনসাব)। যদিও ইনসাব তার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র নিয়েছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই শেষ। পাননি কোনো ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা ও সংসার চালানোর সহায়তা। আর সেই থেকে ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি।
নাখালপাড়ার লোহাপট্টিতে কাজ করেন মো. শাহীন। তিনি জানান, তারকাঁটা, জিআই তার তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করে আয় হয় মাত্র ৬০০ টাকা। এই আয় দিয়ে জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্ত্রী কয়েকটি বাসায় কাজ করে বলে কিছু বাড়তি আয় হয়। জীবনে একবার দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। তখন যে কোম্পানিতে কাজ করেছিলেন, তারা চিকিৎসার জন্য কিছু সহায়তা করলেও যে কয়দিন কাজে যেতে পারেননি, সে কয়দিনের মজুরিও পাননি।
নিহত নির্মাণ শ্রমিকের সংখ্যা
কর্মক্ষেত্রে নানা দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছেন শ্রমিকরা। নিহতের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গত বছরের সংবাদপত্রভিত্তিক জরিপ বলছে, পরিবহন খাতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৮ জন বা ১১ শতাংশ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে নির্মাণ খাতে। অর্থাৎ ঝুঁকি বিবেচনায় নির্মাণ খাতের অবস্থান দ্বিতীয়। গত ১০ বছরের তথ্যও তাই বলছে। নির্মাণ খাতে গত এক দশকে ১ হাজার ১২৮ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২১ সালে ১৫৪ জন, ২০২০ সালে ৮৪ জন, ২০১৯ সালে ১৩৪ জন, ২০১৮ সালে ১৬১ জন, ২০১৭ সালে ১৩৪ জন, ২০১৬ সালে ৮৫ জন, ২০১৫ সালে ৬১ জন, ২০১৪ সালে ১০২ জন এবং ২০১৩ সালে ৯৫ জন নিহত হন।
নিহত শ্রমিকের পরিবার বা আহত শ্রমিকদের কতজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, তার হিসাব মেলেনি কারও কাছ থেকে। তবে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্ঘটনার শিকার হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না।
ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ মুহূর্তে তার কাছে আহত বা নিহতদের ক্ষতিপূরণের হিসাব নেই। তবে কোথাও নির্মাণ শ্রমিকরা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা হয়। তবে সরকারি সংস্থাগুলো তদারকি না বাড়ালে এ বিষয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে না।
বিলসের পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন বলেন, তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। কারণ তারা এটি ১১টি দৈনিক পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো একসঙ্গে প্রকাশ করেন। আর তাদের মতো সংগঠনের পক্ষে আলাদাভাবে শ্রমিক দুর্ঘটনা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়।
শ্রম আইন এবং জাতীয় ইমারত নির্মাণ নীতিমালা
শ্রম আইন-২০০৬ ও ইমারত নির্মাণ নীতিমালা-২০২০-এ শ্রমিক সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ বিষয়টি থাকলেও এটি অনেকটা কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই-এর মতো অবস্থা। জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় নির্মাণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা আছে। এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণের সময় চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিতে হবে। উঁচু স্থানে কাজ করার সময় লিফট, সেফটি বেল্ট, শক্ত দড়ি-মাচা ব্যবহার; কাজের সময় মাথায় হেলমেট, পায়ে গামবুট ও মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু মেগা প্রকল্প ছাড়া খুব কম প্রকল্পেই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে দেখা যায় শ্রমিকদের।
আর শ্রম আইন-২০০৬-এর দুর্ঘটনাজনিত শ্রমিকের জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা, কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নামে তিনটি অধ্যায় রয়েছে। এসব অধ্যায়ে শ্রমিকের ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তির জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। যার ব্যত্যয় হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু শ্রমিকরা এসব আইন ও বিধিবিধান সম্পর্ক কিছুই জানেন না। ফলে বঞ্চিত হন ক্ষতিপূরণ আদায় থেকে।