প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ১৮:৫৫ পিএম
আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ২০:০৩ পিএম
ভ্যাটের আওতায় থাকলেও ফেসবুক-গুগলের মতো প্রযুক্তি খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে নিজস্ব অফিস চালু করতে বাধ্য করা উচিত। শনিবার (২৯ এপ্রিল) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘ট্যাক্সিং দ্য ডিজিটাল ইকোনমি: ট্রেড-অফস অ্যান্ড অপরচুনিটিস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ফেসবুক-গুগলের মতো বড় কোম্পানি এ দেশে আসছে। এদেরও করের বিষয় আসছে। সেখানে রাজস্ব আদায়ের বড় সুযোগ আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রোগ্রামে আমরা ঢুকেছি। সেখানে কিছু টার্গেটও দেওয়া আছে। তিন বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে। দেশের ডিজিটাল ইকোনমির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার ২০২২ সালে ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন, যা ২০২৬ সালে সাড়ে ১০ বিলিয়নে পৌঁছবে। ই-ক্যাবের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০, যার মধ্যে ৯৫ শতাংশের আকার ছোট। সাড়ে চার হাজারের মতো সফটওয়্যার কোম্পানি আছে, ৪০০’র বেশি প্রতিষ্ঠান ৮০টির বেশি দেশে সফটওয়্যার রপ্তানি করছে। ৩৬ হাজার ৮০০ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। ফ্রিল্যান্স থেকে আয়ে আমরা বিশ্বে অষ্টম। ফেসবুক, গুগল কিংবা ইউটিউবে অ্যাড রিভিনিউ থেকে কত টাকা আয় করে সেটার সঠিক হিসাব নেই। ২০২৭ সালে ওটিটির গ্রাহক ১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইটির ২৮টি খাতকে আমরা আয়কর অব্যাহতি দিয়েছি। এগুলোর কার্যকারিতা আছে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত। এগুলো নিয়ে এখন ভাবার সুযোগ রয়েছে। দেশের অনেক বড় প্রতিষ্ঠান ফেসবুক, গুগলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সেখান থেকে তারা ভ্যাট দিলেও ট্যাক্স দিচ্ছে না।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ই-কমার্সের মতো বিশাল খাতকে কর ব্যবস্থার মধ্যে আনলে আমরা অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন করতে পারব। এতে সঞ্চালনের ঘাটতি মিটবে।
প্যানেল আলোচনায় বেসিসের পরিচালক হাবিবুল্লাহ নিয়ামুল করিম বলেন, ডিজিটাল ইকোনমি আলাদা কোনো ইকোনমি না। ভবিষ্যতে প্রথাগত ইকোনমির সঙ্গে ডিজিটাল ইকোনমির এ পার্থক্য আর থাকবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভ্যাটের আওতায় নেই। ৯০ শতাংশ বেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ৮০ লাখ টাকার নিচের ফ্লোতে আছে। ই-কমার্সের ওপর যদি ভ্যাট আরোপ করি তাহলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খুব বেশি সমস্যা হবে না। ক্রস বর্ডার ট্রানজেকশনের ক্ষেত্রে ফেসবুক-গুগল ছাড়াও অনেক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের থেকেও রাজস্ব আদায় করা দরকার। ফেসবুক-গুগলকে অফিস করতে বাধ্য করতে হবে।
ই-ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন বলেন, ই-কমার্স যত এগুবে ডিজিটাল ইকোনমির সম্প্রসারণ তত দ্রুত হবে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার ছিল ৭০০ কোটি টাকার মতো। তখন ভারতে ইউনিকর্ন তৈরি হয়ে গেছে। ২০২৩ বাংলাদেশ বিকাশের মতো একটা ইউনিকর্ন বা বড় কোম্পানি তৈরি হয়েছে। আমাদের ১০-২০টার বেশি ইউনিকর্ন তৈরি হলে ট্যাক্স আদায় সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ট্যাক্স না দেওয়ার মন মানসিকতা থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসা দরকার।
বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার সোসাইটির চেয়ারম্যান তানজীবা রহমান বলেন, একজন ফ্রিল্যান্সার দেশের ডিজিটাল রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তিনি আয়ের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ দেশে নিয়ে আসতে পারেন। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, কর কাঠামোতে অনেক সমস্যা আছে। সিগারেট থেকে সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স আদায় করে এনবিআর। সেখানেও একাধিক টায়ার। এত সমস্যা সমাধান না করে ডিজিটাল ইকোনমিতে যাওয়া যাবে না। রাজস্ব বোর্ডকে পুরো অটোমেশন করা দরকার।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ বলেন, আগে আমাদের ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত কেন কম হচ্ছে, কোথায় কোথায় লিকেজ সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আদায় কেন বাড়ছে না, সেটা জাতীয় সংসদেও আলোচনা হওয়া দরকার। লিকেজগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আলোচনা হওয়া দরকার।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখানে ট্রানজেকশনগুলো এত ছোট, যদি প্রত্যেকটাতে ট্যাক্স বসাতে চান সেখানে জটিলতা আসবে। শেষে ভোক্তা পর্যায়ে দিতে গেলেও ১০ রকমের সমস্যা আসবে। দেশে বিজনেস মডেল পরিস্কার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসছে। নিয়মনীতির ভিত্তিতে এই বিজনেস মডেল আনতে হবে। এখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আনতে হবে। এ খাতে কর আদায়ে সাম্যতা রাখেতে হবে, কর আদায়ে দক্ষতা বাড়াতে এবং কর আদায় খুবই সহজ করতে হবে।