ফয়সাল খান ও মো. শাহজাহান
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১০:৩২ এএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৪২ এএম
২০১৬ সালে ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল রবিবারও এ প্রতিষ্ঠানটি সংবাদ সম্মেলন করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার যে তালিকা প্রকাশ করে, সেখানেও রয়েছে এ মার্কেটের নাম। কিন্তু ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রস্তুত করা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকায় এ মার্কেটের নাম নেই!
রহস্যজনক কারণে এ মার্কেটটি ডিএসসিসির ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। কারণ ২০১৮ সালে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনায় মার্কেটটির দোকান থেকে সালামি আদায় ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় মার্কেটটি ভেঙে ফেলার ব্যাপারেও তৎপরতা শুরু হয়েছিল।
গত শনিবার ভোরে নিউ সুপার মার্কেটে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস আবারও জানিয়েছে, ২০১৬ সালেই ভবনটিকে ‘অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ওই সময় ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেটিকে নিরাপদ করতে বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনার কিছু বাস্তবায়ন হলেও এটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করা হয়েছে বলে মনে হয় না।
ডিএসসিসির তালিকা প্রশ্নবিদ্ধ
গতকাল ঢাকার ৫৮টি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের তালিকা প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিস। এ তালিকায় নিউ সুপার মার্কেটের নাম দেখার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মাত্র কয়েক মাস আগে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রস্তুত করা ডিএসসিসির তালিকা থেকে এটির নাম বাদ পড়ার কারণ কী। কারণ এই তালিকায় সংস্থাটির পুরোনো ৫টি অঞ্চলের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার সর্বশেষ তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। এমনকি ভেঙে ফেলা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং সে স্থানে নতুন ভবন তৈরির তথ্যও সংযোজন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানার জন্য যোগাযোগ করা হয় ডিএসসিসির পরিবেশ ও জলবায়ু সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকা প্রণয়ন কমিটির সদস্য খায়রুল বাকেরের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘একটি স্থাপনা অনেক দিক বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আগুনের এক ধরনের ঝুঁকি, যা নিয়ে ফায়ার সার্ভিস কাজ করে। আমরা স্থাপনাগুলোর কাঠামোগত ঝুঁকি বিবেচনায় তালিকা তৈরি করেছি।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাজার সার্কেলের সাবেক একজন প্রকৌশলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, এই মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০১৮ সালে ট্রেড লাইসেন্স ও বাজার সালামি নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ক্ষমতার পালাবদলে ওপর মহলের নির্দেশে আবারও কৌশলে এখানে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং সালামি আদায়ের কাজ শুরু হয়।
নিউ সুপার মার্কেটে আগুন, ফের অনেক বার্তা
রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) ১ হাজার ২৪৫টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানের ট্রেড লাইসেন্স ও বাজার সালামিও নেওয়া হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় কয়েক বছর আগে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও বাজার সালামি বন্ধ রাখার পর পুনরায় কেন তা শুরু করা হলো, তা জানতে গতকাল রাতে মোবাইল ফোনে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি এ ব্যাপারে সংস্থাটির মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে জনসংযোগ কর্মকর্তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাঠপর্যায়ে কাজ করা ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, পরিদর্শনের সময় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পেলে কোনো স্থাপনার নাম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। নিউ সুপার মার্কেটও এর ব্যতিক্রম না। যদি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি থাকত, তা হলে ফায়ার সার্ভিসের তালিকায়ও এর নাম না থাকার কথা।

এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নিজেদের মালিকানাধীন মার্কেট ডিএসসিসির তালিকায় আছে কী নেই তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিটি করপোরেশন যেহেতু মার্কেটের মালিক, তাই এটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণ করবে থার্ড পার্টি। যেহেতু ফায়ার সার্ভিস বারবার মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে আসছে, সেহেতু সেটি বিবেচনায় নিয়েই কাজ করা উচিত।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সিটি করপোরেশন মার্কেটটিতে একবার ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ভাড়া আদায় বন্ধ করে আবারও তা চালু করেছে। ওই মার্কেটে চলাচল ও আলো-বাতাস প্রবেশের জায়গায় অবৈধ দোকান রয়েছে। সেসব বহালতবিয়তে রয়েছে। তাহলে আগুনের ঘটনায় দায় করপোরেশন কীভাবে এড়াবে?
দেড় যুগ ধরে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটটি
নিউ সুপার মার্কেটের অবস্থান ডিএসসিসির অঞ্চল-১-এ। এই অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে পাঁচটি স্থাপনাকে। মিরপুর রোডের ‘নিউমার্কেট-গাউছিয়াসংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজ’ও রয়েছে এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকায়।
১৯৫৪ সালে ঢাকার নিউমার্কেট ও আশপাশের মার্কেটগুলো গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটকে (দক্ষিণ) ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করে। এরপর ফায়ার সার্ভিসও বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনকে বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়। কিন্তু মার্কেট অপসারাণ বা ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নিউমার্কেটের সিঁড়ি, আলো-বাতাস চলাচলের খোলা জায়গা দখল করে ১৯টি দোকান তৈরি করে বরাদ্দ দেন সিটি করপোরেশনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। সংস্থাটির সম্পত্তি বিভাগ থেকে ২০১০-১১ সালে এসব অস্থায়ী ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব অবৈধ দোকানসহ ফুটপাতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে দোকান মালিকদের দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিউমার্কেট এলাকায় ওপেন সিক্রেট।
অঞ্চল-১-এর রাজস্ব বিভাগ থেকে জানা গেছে, নিউ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এক ধরনের ব্যবসায়ের কথা উল্লেখ করে ট্রেড লাইসেন্স নেন। কিন্তু কাজ করেন ভিন্ন। সাধারণ ব্যবসায়ের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হলেও এখানে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করা হচ্ছে। প্রিন্টিং প্রেস, হোটেল ও মেস পরিচালনা করা হচ্ছে। অথচ এ মার্কেটে এ ধরনের ব্যবসায়ের অনুমোদন নেই।
গত শনিবার ভোরে রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৪৩টি দোকান পুড়ে যায়। আহত হন অন্তত ৪০ জন। এ মার্কেট নিয়ে বারবার ফায়ার সার্ভিসের সতর্ক করার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে মারাত্মক এ ঘটনা ঘটেছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর ৫৮টি মার্কেট অগ্নিঝুঁকিতে : ফায়ার সার্ভিস
প্রথমে বঙ্গবাজার, পরে নবাবপুরের একটি মার্কেট, তারপর নিউ সুপার মার্কেট। রাজধানীতে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’, ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এই তিন ধরনের অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট ও শপিং মলের তালিকা প্রকাশ করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকা মহানগর এলাকার ৫৮টি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট ও শপিং মল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে ৯টিকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টিকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৩৫টি মার্কেটকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সংস্থাটি।

গতকাল দুপুর দেড়টায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট ও শপিং মলের অগ্নিঝুঁকি নিরসন এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে এ সংবাদ সম্মেলন করে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া অধিক অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে ঢাকার ৯টি শপিং মল। এগুলো হলো- নিউমার্কেট রোডের গাউছিয়া মার্কেট, ফুলবাড়িয়ার বরিশাল প্লাজা মার্কেট, টিকাটুলির রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট, লালবাগের আলাউদ্দিন মার্কেট, চকবাজারের শাকিল আনোয়ার টাওয়ার ও শহিদুল্লাহ মার্কেট, সদরঘাটের শরীফ মার্কেট ও মায়া কাটারা এবং সিদ্দিক বাজারের রোজনীল ভিস্তা।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ঢাকার শপিং মল, মার্কেট, আবাসিক হোটেল, আবাসিক ভবন ও রেস্টুরেন্ট পরিদর্শন করে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৫১১টি ভবনকে অগ্নিঝুঁকি ও অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে এগুলো এখন পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়নি। করোনার কারণে হালনাগাদ কার্যক্রম থেমে ছিল, তবে এ বছর থেকে আবার তা শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘নিউ সুপার মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড নাশকতা হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এ নিয়ে তদন্ত করছেন। তবে নিউ সুপার মার্কেটটি আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় ছিল। বারবার ঝুঁকিপূর্ণ থাকার বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে।’
বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ডে তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে। তবে সে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখনও কোনো নাশকতার আলামত পাওয়া যায়নি।’
প্রতিটি মার্কেট ও শপিং মলে সম্মিলিতভাবে কিছু লোক রেখে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এভাবে পাহারা দেওয়ার ফলে একদিকে নাশকতামূলক কাজ ঠেকানো যাবে, অন্যদিকে বর্তমানে বিপুল তাপমাত্রার কারণে দাহ্য বস্তু জ্বলে উঠলে এই পাহারাদাররা ঘটনা দ্রুত নজরে আনতে পারবেন। তিনি সবাইকে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ও মহড়া আয়োজন করার অনুরোধ জানান।