ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৫:৫৫ পিএম
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ড। বৃহস্পতিবার তোলা। প্রবা ফটো
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে এখানে আসেন হাজারো মানুষ। গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালটির আউটডোরে কথা হয় রশ্মি বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বললেন, ‘তিন দিন আগে এখানে সন্তানের জন্ম হয়েছে। সেলাই খুলে গেছে আজ। ডাক্তার বলেছেন, ইনফেকশন হয়েছে। আবার ভর্তি হতে হবে। ভয় করছে আমার।’
ইনফেকশনের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সদ্য মা হওয়া সুরভী রায়। তার অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। সেলাই কাটতে এসে দেখেন সেখানে সিজারের পর ইনফেকশন হয়েছে।
সুরভী বলেন, সিজারের সময়ই প্রায় ৩০ হাজারের খরচ হয়েছে। ইনফেকশন হওয়ায় আবার অনেক ওষুধ খেতে হচ্ছে। কিন্তু এত টাকার সংস্থান করা তার ফুচকা ব্যবসায়ী স্বামীর জন্য কঠিন।
এই নারী বলেন, হাসপাতালে ওষুধ ছাড়া আর কিছুর খরচ দিতে হয় না, তবে এখানে চলে আয়াদের রাজত্ব। বাচ্চা কোলে তুলে দেওয়া থেকে কেবিনে রোগীকে আনা পর্যন্ত টাকা তোলেন তারা। বাচ্চার জন্য ৬০০ টাকা, প্রতিবার প্যাড পাল্টে দিলে ১০০ টাকা, হুইলচেয়ারে রোগীকে এনে দিলে ৬০০ টাকা। এভাবে ডেলিভারির সময় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয়াদের দিতে হয়।
সুরভী বলেন, ‘ডাক্তার আমাদের দোষ দেন। তাহলে এখানে সিজার করানো বাকিদের প্রায় সবারই কেন ইনফেকশন হলো?’
ইনফেকশনের পর বারবার ড্রেসিং করা হয়। কিন্তু সেখানেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ করেন এই নারী। তার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের এমন গাফিলতির কারণে ইনফেকশন নিয়ে মাসখানেক এ হাসপাতালে থাকতে হয় নারীদের।
সালমা বেগম নামের আরেক রোগী জানালেন, বাচ্চা হওয়ার পর এখন ইনফেকশনের কষ্টে ভুগছেন। সেলাই খুলতে এসে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই নারী। তিনি জানান, সেদিন দায়িত্বরত একজন অপরজনকে সেলাই কাটা শেখাচ্ছিলেন। মনের ভুলে সেলাইয়ের জায়গা অবশ না করেই ব্যান্ডেজে টান দেন। এতে মারাত্মক ব্যথা পান তিনি। ড্রেসিংয়ের সময়ও পোহাতে হয় যন্ত্রণা। ড্রেসিং রুমের সামনে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ছোট বাচ্চা রেখে এতক্ষণ কেউ বসে থাকতে পারে? সাভার থেকে এসেছেন মরিয়ম বেগম। জানালেন, বাড়িতে রিকশাচালক স্বামী রাগ দেখায়। বলেন, কেন এ হাসপাতালে এসেছি?
মরিয়ম আক্ষেপের সুরে বলেন, টাকা বাঁচাতে গরিব মানুষ কেন এ হাসপাতালে আসে? কিন্তু বাস্তবে টাকা তো যায়ই। একটা ট্যাবলেটের দাম ৬০ টাকা। প্রতিদিন দুইটার জন্য ১২০ টাকা লাগে। আরও খরচ আছে। সঙ্গে যুক্ত হয় আয়াদের উৎপাত। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেও সহযোগিতা করে না, শুধু টাকা চায়।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুহি জাকারিয়া। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় ইনফেকশন কম হয়। এর অন্যতম কারণ সেখানে সার্জারির নিয়মগুলো মেনে চলা সম্ভব, যা সরকারি হাসপাতালগুলোতে সম্ভব হয় না।’ তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর এত চাপ থাকে যে, পরিচ্ছন্নতার যেসব নিয়ম থাকে, সব সময় সেগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
অধ্যাপক রুহি জাকারিয়া বলেন, অপারেশনের রোগীকে আলাদা রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে রোগীর বাসা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। অপারেশনের সময় যে যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো পরিষ্কার করার নিয়ম আছে। কেননা এই যন্ত্রগুলো থেকেও ইনফেকশন হতে পারে। আবার রোগী যখন পোস্ট অপারেটিভে যায়, তখনও তাকে দেখতে বাইরে থেকে অনেক মানুষ আসে। ফলে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি হাসপাতালে ইনফেকশন বেশি হয়। ডাক্তার, নার্স থেকে শুরু করে রোগী ও তার পরিবারের লোকজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ইনফেকশন কমাতে প্রচেষ্টার কথাও জানান এই চিকিৎসক। বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়েও আলোচনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রসূতিদের ইনফেকশনের বিষয়ে গাইনি বিভাগের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান। সংক্রমণের জন্য অপারেশন টিমের ব্যর্থতা এবং রোগীর অসচেতনতাকে দায়ী করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, সিজারিয়ান ডেলিভারিতে এত ইনফেকশন হওয়ার কথা না। অপারেশনের সময় নিয়ম মানতে হবে। স্বজনদের রোগীর কাছে আসার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রাখতে হবে। বিষয়টা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
আয়াদের বকশিশ চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কেউ খুশি হয়ে কিছু দিতে পারে। কিন্তু তাদের চেয়ে নেওয়ার নিয়ম নেই।
ডা. খলিলুর রহমান বলেন, এখানে যারা চিকিৎসা নিতে আসে, তারা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। ফলে তাদের কাছ থেকে আলাদা করে কেউ টাকা নিলে তাকে তাৎক্ষণিক বের করে দেওয়া হবে।
শুধু ভর্তি হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রেই নয়; বরং আউটডোরেও ভোগান্তি পোহাতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। নারায়ণগঞ্জে সিএনজি চালান মিরাজ। কিছুদিন ধরে স্ত্রী শাহেদাকে নিয়ে প্রতিদিন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাতায়াত করছেন তিনি। জানালেন, প্রথম দিন স্ত্রীর অসুস্থতা নিয়েই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল।
পরে অবশ্য ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পান। পরীক্ষা করতে দেওয়া হলে আল্ট্রার জন্য টোকেন নেন। কিন্তু ৬০ জনের বেশি রোগীকে টোকেন দেওয়া হয় না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও এদিন টোকেন পাননি তিনি। পরদিন আবারও এসে বিফল হন।
সাভার থেকে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ঊষা রাণী। দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে গিয়ে তার মেয়ের মাথা ঘোরাচ্ছিল। এ অবস্থায় ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাদের।