প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ০০:৩০ এএম
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:৩৬ পিএম
সন্তানকে হারিয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। প্রবা ফটো
‘ও আমার লক্ষ্মী মা। মারে…। আমি এই লাশ ক্যামনে কান্দে নিমু। ও মা…। মাগোরে…’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। একটি পোশাক কারখানায় সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত জাহাঙ্গীরের স্বপ্ন-আশা সব নিজের তিন মেয়েকে ঘিরে। কঠোর পরিশ্রম করে মেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। দুই সপ্তাহ আগে বড় মেয়ে নাদিয়া সুলতানাকে ভর্তি করিয়েছেন রাজধানীর আশকোনার নর্দান ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারে। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণের আগেই বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় নিভে গেল নাদিয়ার জীবনপ্রদীপ।
জাহাঙ্গীর বলছিলেন, ‘ওরা আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল। আমি পরিবার নিয়ে খেয়ে না-খেয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি করিয়েছিলাম। ওর স্বপ্ন ছিল বড় ফার্মাসিস্ট হবে। আমার সব শেষ।’
মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে জাহাঙ্গীর যখন বিলাপ করছিলেন, নাদিয়ার মরদেহের তখন ময়নাতদন্ত চলছে মর্গের টেবিলে।
রবিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানী প্রগতি স্মরণিতে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান নাদিয়া। সহপাঠী মেহেদীর সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে বই কিনতে উত্তরা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দিকে যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তায় নাদিয়াদের মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস। নাদিয়া মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন। এ সময় বাসের একটি চাকা নাদিয়ার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। 
ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শীরা বাসটিকে আটক করলেও বাসের চালক ও তার সহকারী পালিয়ে গেছে। এদিকে যে বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন নাদিয়া তাকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
নাদিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে এ ঘটনার বিচার দাবিতে তার সহপাঠীরা বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কাওলা ব্রিজের নিচে জড়ো হয়ে বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে এমনিতেই ওই এলাকার কয়েকটি সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল। অবরোধের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তীব্র যানজটে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন পরিবহনের যাত্রী ও পথচারীরা। পরে পুলিশের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে সন্ধ্যার দিকে যান চলাচল শুরু হয়।
ঘটনার পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে গিয়ে দেখা যায়, নাদিয়ার বাবা-মা ও স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। স্বজনরা জানান, নাদিয়াদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায়। পরিবারের সঙ্গে সে নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকায় বাস করত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর যাতায়াতের সুবিধার্থে ক্যাম্পাসের পাশে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সহপাঠীদের সঙ্গে একটি বাসায় উঠেছে সে। মাত্র ১০ দিন আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে ওই বাসায় ওঠে নাদিয়া।
নাদিয়ার মা পারভিন আক্তার কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, সকালে ফোনে মেয়ে তাকে জানিয়েছিল, একটু কাজে বাইরে বের হবে। তিনি বারণ করে বলেছিলেন, ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের কারণে রাস্তায় যানজট থাকবে, তাই আজ বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। এরপর ফোনে মেয়ের মৃত্যুর খবর পান তিনি।
এ ঘটনায় রাতে ভাটারা থানায় মামলা করেছেন নাদিয়ার বাবা। ভাটারা থানার ওসি এবিএম আসাদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ভিক্টর পরিবহনের বাসটি আটক করা হয়েছে। চালক-সহকারীকে দ্রুতই আটক করা সম্ভব হবে। ময়নাতদন্ত শেষে নাদিয়ার মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পটুয়াখালীর বাড়িতে নাদিয়াকে দাফন করা হবে।
শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রসঙ্গে বিমানবন্দর থানার ওসি আজিজুল হক বলেন, বাসের ধাক্কায় সহপাঠী নিহতের বিচার চেয়ে নর্দান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এতে কিছুটা যানজট হয়েছে। পরে পুলিশের অনুরোধে তারা রাস্তা ছেড়ে চলে গেলে যান চলাচল শুরু হয়।