রানা হানিফ
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৫:০৬ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:১৬ পিএম
বাসে চালু হয়েছে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা। ছবি : সংগৃহীত
গত বছরের ২৩ নভেম্বর রাজধানীর ইসিবি চত্বর থেকে যমুনা ফিউচার পার্কে যাচ্ছিলেন আনিছুল ইসলাম। এ সময় নূর এ মক্কা পরিবহন লিমিটেডের বাসে তাকে ভাড়া গুনতে হয় ১৫ টাকা। নভেম্বরে মিরপুর অঞ্চলের সব বাস কোম্পানিতে চালু করা হয় ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থা।
ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির উদ্যোগে চালু হওয়া এ সেবার আওতায় আনিছুল ওইদিন ১৫ টাকা পরিশোধ করে ই-টিকিট নেন। ঠিক এর এক দিন পর ২৪ নভেম্বর আনিছুল ইসিবি চত্বর থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক (নর্দ্দা) পর্যন্ত যান অছিম পরিবহন প্রাইভেট লিমিটেডের বাসে। এদিন তিনি কোম্পানিটির কর্মীকে ১০ টাকা পরিশোধ করে ই-টিকিট কেনেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রকাশিত ভাড়ার তালিকা থেকে দেখা যায়, ইসিবি চত্বর থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক (নর্দ্দা বাসস্ট্যান্ড) পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা।
আনিছুলের প্রশ্ন, যদি ই-টিকিটের মাধ্যমে ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধ করা হয় তাহলে একই দূরত্বে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির ভাড়া ভিন্ন ভিন্ন কেন? ই-টিকেটিং বা ইলেকট্রনিক টিকেটিং ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দূরত্বের জন্য একই ভাড়া হওয়ার কথা। যে কোম্পানিরই বাস হোক না কেন, ডিভাইসে একই গন্তব্য দেওয়া মাত্রই তো একই ভাড়া নেওয়ার কথা।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা তথা দেশে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে মেট্রোরেল সার্ভিস। এ সেবা পেতে যাত্রীদের জন্য রয়েছে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা। যেখানে টিকেটিং মেশিনে নির্দিষ্ট গন্তব্য পছন্দ করার পর নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করা যাবে। এই টিকেটিং ব্যবস্থার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট ডেটাবেস সার্ভার।
১৩ নভেম্বর থেকে প্রথম পর্যায়ে মিরপুর অঞ্চলের ৩০টি বাস কোম্পানির সব বাসে চালু হয় ই-টিকেটিং ব্যবস্থা। নেই কোনো একক বা কেন্দ্রীয় ডেটা সার্ভার। স্ব-স্ব বাস কোম্পানি তাদের ব্যবহৃত ই-টিকিটের পস মেশিনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণ করে দিচ্ছে। আর স্ব-স্ব কোম্পানির সব পস মেশিন নির্দিষ্ট নিজস্ব কোনো সার্ভারের সঙ্গেও যুক্ত আছে কি না, তা-ও জানে না সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।
মালিক সমিতির উদ্যোগে চালু হওয়া এ ই-টিকেটিং ব্যবস্থা সম্পর্কে ‘আনুষ্ঠানিকভাবে’ অবগত নয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। চালু হওয়া এসব ই-টিকেটিং ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, ভাড়া নির্ধারণ প্রক্রিয়া কিংবা এ ব্যবস্থার অনিয়ম তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে না বিআরটিএ।
মালিক সমিতির উদ্যোগে চালু হওয়া ই-টিকেটিং ব্যবস্থা এবং সম্প্রতি চালু হওয়া মেট্রোরেল সার্ভিসের ই-টিকেটিং ব্যবস্থা একই ধরনের কি না, প্রতিদিনের বাংলাদেশের এমন প্রশ্নের উত্তরে সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘জানি না।’
সমিতির উদ্যোগে চালু হওয়া ই-টিকেটিং ব্যবস্থা একক বা কেন্দ্রীয় কোনো সার্ভারের অধীনে চলছে কি না, জানতে চাইলে খন্দকার এনায়েত বলেন, ‘সমিতির কেন এমন সার্ভার থাকবে? এটা তো যে যে কোম্পানি ই-টিকেটিংয়ে এসেছে, তারা নিজস্ব সার্ভার ব্যবহার করবে।’
নির্দিষ্ট সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে ই-টিকেটিং ব্যবস্থায় কীভাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নে এই পরিবহন মালিক নেতা বলেন, ‘যে যে বাসে ই-টিকেটিং চালু হয়েছে, সেগুলোর পস মেশিনে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।’
ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির চালু করা ই-টিকেটিং ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মুখপাত্র ও রোড সেফটি উইংয়ের পরিচালক শেখ মাহবুব-ই-রাব্বানি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ই-টিকেটিং ব্যবস্থা বাস কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এখানে বিআরটিএর কোনো সিদ্ধান্ত বা অংশগ্রহণ নেই। আমরা ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ করে দিই। এরপর কোম্পানিগুলো যে পদ্ধতিতে তাদের সুবিধা, সে পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় করবে। বিআরটিএ মনিটরিং করবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে কি না, সেটা ই-টিকেটিং হোক আর ম্যানুয়াল। আমাদের কাছে অভিযোগ এলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
চালু হওয়া ই-টিকেটিং ব্যবস্থার পস মেশিনে বিআরটিএর মাধ্যমে বা সংস্থার কোনো প্রকার সম্পৃক্ততায় ভাড়ার তালিকা বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে না বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ই-টিকেটিং বা স্মার্ট টিকেটিং ব্যবস্থা আপনি তখনই বলতে পারবেন, যখন বাসের শিডিউল মেইনটেন করতে পারবেন। যাত্রীকে বিভিন্ন অফারে সাপ্তাহিক, মাসিক, বার্ষিক ভ্রমণ কার্ড সুবিধা দিতে পারবেন। যাত্রী টিকিট কেনার পর যেন নিশ্চিত থাকে কখন তার বাসটি আসবে, কখন পৌঁছাবে। আর এখন যেটা হচ্ছে, তা হলো বাস আসছে বা বাসে উঠে তারপর টাকা দিয়ে টিকিট কেনা। আর ই-টিকেটিংয়ের নামে বড় যে অনিয়মটা হচ্ছে বা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে, তা হলো নির্ধারিত ভাড়া নির্ধারণ। পস মেশিনে কে বিআরটিএর চার্ট অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে দিচ্ছে? বিআরটিএ কি এটা মনিটরিং করছে বা মালিক সমিতি বিআরটিএকে দিয়ে নির্ধারণ করিয়ে আনছে? আনছে না। একেক কোম্পানি নিজেরা নিজেদের মতো পস মেশিনে ভাড়া বসিয়ে দিচ্ছে। আর যাত্রীকে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বিআরটিএর চার্ট অনুযায়ী ভাড়া বলে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সড়কে অনিয়ম ঠেকানো বা শৃঙ্খলায় আনার নামে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যা আগের পদ্ধতির আধুনিকায়ন মাত্র। এগুলো কিছুই করতে হতো না, যদি না মালিক সমিতি রমিজ উদ্দিনের শিক্ষার্থী দুর্ঘটনার পর যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার ৫০ শতাংশও বাস্তবায়ন করত। ই-টিকেটিংয়ে সামান্য উপকার হচ্ছে, তা হলো আগে যাত্রীরা কন্ডাক্টরকে টাকা দিত কিন্তু টিকিট পেত না, এখন অন্তত একটা কাগজ পাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যেটা তারা ই-টিকেটিং বলছে এটা মূলত বিভিন্ন শপিং মল, সুপারশপ এমনকি অনেক পার্কিং স্পটেও এমন রসিদ দেওয়া হয়। তবে তাদের সঙ্গে বাসমালিকদের ই-টিকেটিংয়ের বড় পার্থক্য হলো, অন্যদের রসিদে নির্ধারিত মূল্য পরিবর্তন করা যায় না এবং ভ্যাট যুক্ত থাকে। আর বাসমালিকদের চালু করা ই-টিকেটিংয়ে বলা হচ্ছে বিআরটিএর ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গে কোনো মিলই নেই। একই সঙ্গে তাদের পস মেশিনের সঙ্গে এনবিআরের ভ্যাট যুক্ত নেই।’
তিনি বলেন, ‘ই-টিকেটিং চালু করে রাস্তায় একই কোম্পানির একাধিক বাসের মধ্যে কি অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে পেরেছে? পারেনি। সেই আগের মতোই প্রতিযোগিতা চলছে। আসলে যতই বলুক কোম্পানি এক, বাস্তবতা হচ্ছে একেক বাসের মালিক একেকজন। এজন্য বারবার আমরা বলেছি বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের কথা। হাতিরঝিল প্রকল্পে চক্রাকার বাস সার্ভিস কি চলছে না? তারা যাত্রীর কাছ থেকে টাকা যেমন নিচ্ছে সার্ভিসটাও দিচ্ছে।’