ডিএসিসির ৫০নং ওয়ার্ড
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই, কারণ সেখানে বসেছে হকারদের চৌকি। বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নামবেন? সেখানেও সারি সারি বাস, অটোরিকশা আর ভ্রাম্যমাণ দোকানের রাজত্ব। দিনভর এমন যানজট আর কোলাহল ঠেলে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলে সেখানেও মেলে না স্বস্তি; কারণ চুলায় জ্বলে না আগুন। দখল, যানজট, বর্জ্য আর গ্যাস সংকটে এভাবেই একপ্রকার হাঁসফাঁস করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দারা। নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় এসব নাগরিক দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই।
সরেজমিনে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর হাজী সামাদ সুপার মার্কেটের সামনে দেখা যায়, ফুটপাতজুড়ে হকারদের ছোট ছোট চৌকির পসরা। এই অবৈধ দখল বাম দিকে ৯৫ নম্বর শহীদ ফারুক রোড পর্যন্ত বিস্তৃত। শুধু ফুটপাতেই এ দখলদারত্ব সীমাবদ্ধ নেই; হকারদের সারির সমান্তরালে মূল সড়কের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়মিত দাঁড়িয়ে থাকছে যাত্রাবাড়ী-টঙ্গী রুটের তুরাগ পরিবহন। কিছুটা পশ্চিমে চোখে পড়ে বাবু বাজারগামী বাহাদুর শাহ পরিবহনের বাস ও সিএনজি-অটোরিকশার অঘোষিত স্ট্যান্ড।
তাজ সুপার মার্কেট ও ইদ্রিস মার্কেটের সামনের পরিস্থিতি আরও নাজুক। দিনের বেলা ফুটপাত অবরুদ্ধ থাকে অস্থায়ী দোকানে, আর সন্ধ্যা নামতেই ফুচকা ও চটপটির ভ্রাম্যমাণ গাড়িগুলো নেমে আসে মূল সড়কে। ইদ্রিস মার্কেটের প্রবেশমুখেই বসেছে শিশুদের পোশাক ও শরবতের দোকান। তার সামনে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা রিকশা ও বাসের সারি। স্তরে স্তরে গড়ে ওঠা এসব অনিয়ন্ত্রিত অবস্থানের কারণে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অসম্ভব। পশ্চিম ও উত্তর যাত্রাবাড়ীর মার্কেটগুলোর সামনের চিত্রও অভিন্ন; সেখানে স্থায়ী দোকানদাররাও নিজেদের পণ্য সাজিয়ে রেখেছেন ফুটপাত ছাড়িয়ে রাস্তায়।
এলাকার তাজ সুপার মার্কেটের এক মোবাইল ফোন বিক্রেতা সুলাইমান শেখ (ছদ্মনাম) আক্ষেপ করে বললেন, “হকার আর যানবাহনের কারণে রাস্তার প্রায় ৮০ শতাংশই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত কাউন্সিলর নেই, তাই অভিযোগ জানানোরও জায়গা নেই। প্রতিবাদ করতে গেলে দখলদাররা সংঘবদ্ধ হয়ে ভয়ভীতি দেখায়, গায়েও হাত তুলতে আসে”।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাহাদুর শাহ পরিবহনের প্রায় ৩৫টি বাস প্রতিদিন কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে সড়ক দখল করে রাখে। এতে সড়কের ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তীব্র যানজট লেগেই থাকে।
এ বিষয়ে বাহাদুর শাহ পরিবহনের চালকের সহযোগী রাজীব বলেন, “এখানে গাড়ি দাঁড় করানোর জন্য এখন কাউকে চাঁদা দিতে হয় না। তবে লাইনম্যান প্রতি ট্রিপে ২০ টাকা করে নেয়”।
সড়ক দখল ও যানজটের বিষয়ে জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী মোড়ে দায়িত্বরত ডিএমপির ওয়ারী ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক (টিআই) মাহমুদ আলম মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ওয়ারী ট্রাফিক জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আজাদ রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সড়ক দখলের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান। কিন্তু একদিকে উচ্ছেদ করলে অন্যদিকে তারা আবার বসে পড়ে। আশপাশের মার্কেটে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সড়কে গাড়ি রাখেন। তবে বাহাদুর শাহ পরিবহনের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছি, প্রয়োজনে ডাম্পিংয়েও পাঠানো হচ্ছে”।
দখল-যানজটের পাশাপাশি এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট করছে যত্রতত্র ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনা। তাজ সুপার মার্কেটের সামনের ভাঙাচোরা সড়ক বিভাজকের (মিডিয়ান) ওপর প্লাস্টিক, পলিথিনের বস্তাসহ বিভিন্ন বর্জ্যের স্তূপ জমে থাকতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ডিএসসিসির অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু আসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, “ময়লা হওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এটি নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে। তবে যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলতে সাধারণ জনগণকেও সচেতন হতে হবে”।
সড়কের এই নৈরাজ্য পেরিয়ে এলাকার মানুষ যখন ঘরে ফেরেন, সেখানেও তাদের জন্য অপেক্ষা করে আরেক ভোগান্তি। দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে নাকাল ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। বিশেষ করে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর সুরুজনগর এলাকায় সকাল ও সন্ধ্যায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে, চুলায় আগুনই জ্বলে না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গাফফার বলেন, “আমরা নিয়মিত বিল দেই, কোনো বকেয়া নেই। তাহলে গ্যাস পাব না কেন? রান্না করতে না পেরে চরম কষ্টে দিন পার করছে পরিবারগুলো। কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত”।
গ্যাস সংকটের সত্যতা স্বীকার করে তিতাস গ্যাসের দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী শাখার ইনচার্জ ছৈয়দ আহমদ ফজলে হাসান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে, ফলে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত চাপ থাকছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবগত আছেন এবং সমাধানের চেষ্টা চলছে”।
ওয়ার্ডে বর্তমানে কোনো নির্বাচিত কাউন্সিলর নেই। এতে নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মনিরুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “কাউন্সিলর না থাকলেও নাগরিক সেবা চালু রয়েছে। আমি ৪০ নম্বর ওয়ার্ডেরও দায়িত্বে আছি। নাগরিক সনদসহ প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করছি। কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাই”।
কর্তৃপক্ষ আশার বাণী শোনালেও যাত্রাবাড়ীর এই ব্যস্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা ভিন্ন। ফুটপাত থেকে বসার ঘর সবখানেই যেন জেঁকে বসেছে অব্যবস্থাপনা। জনদুর্ভোগের অবসানে এখন দরকার কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।