পার্ক দখল করে চলছে অবৈধ ভ্যান স্ট্যান্ড, মৌসুমি ফলের আড়ত আর অননুমোদিত বাণিজ্যিক রাইডসের রমরমা রাজত্ব। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের কংক্রিটের জঙ্গলে একচিলতে স্বস্তির নাম শহীদ মতিউর পার্ক। কাগজে-কলমে এটি ৪ একর ৩৫ শতাংশের এক সুবিশাল সবুজ উদ্যান যা ঢাকা শহরের অন্যতম একটি ‘ফুসফুস’।
কিন্তু সংবেদনশীল এলাকায় বঙ্গভবনের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত পার্কটি এখন নিজেই যেন শ্বাসকষ্টে ভুগছে। সবুজের বদলে সেখানে এখন অবৈধ ভ্যান স্ট্যান্ড, মৌসুমি ফলের আড়ত আর অননুমোদিত বাণিজ্যিক রাইডসের রমরমা রাজত্ব। প্রশাসনিক ধীরগতি ও ইজারা-জটিলতার সুযোগ নিয়ে পার্কটি কার্যত গিলে খাচ্ছে কয়েকটি প্রভাবশালী চক্র।
সরেজমিন নৈরাজ্যের চিত্র: পার্কের ৩ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে বেআইনি বাণিজ্যের বহর। প্রবেশপথের সামান্য দূরেই সারিবদ্ধ মোটরবাইক আর হকারদের ভ্যান দিয়ে রাস্তা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোতেই দেখা যায় যত্রতত্র ময়লারস্তূপ। আগাছা আর ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে পার্কের একাংশ। নিয়মবহির্ভূতভাবে পার্কের উন্মুক্ত জায়গা ব্যবহৃত হচ্ছে বাণিজ্যিক মোটরসাইকেল পার্কিং হিসেবে। দর্শনার্থীদের জন্য পার্কে প্রবেশের নির্ধারিত সরকারি ফি মাত্র ১০ টাকা হলেও, প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে পার্কিংয়ের নামে আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা।
পার্কের পূর্ব পাশে রাইড পরিচালনাকারীদের থাকার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে স্থায়ী টিনের ঘর। দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে বসেছে মৌসুমি লিচুর আড়ত। অন্যদিকে, পার্কের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে কাপ্তান বাজার ডিম পট্টির প্রায় ৩২টি ভ্যান নিয়মিত পার্কিং করা হচ্ছে এখানে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি শক্তিশালী চক্র টাকার বিনিময়ে পার্কের জায়গাকে কার্যত অবৈধ স্ট্যান্ডে পরিণত করেছে।
ম্লান আধুনিকায়নের জৌলুস : খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ২০২০ সালের ২২ মার্চ তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন ‘জল-সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় ৫ কোটি ৬৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ে পার্কটির আধুনিকায়ন করেন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে দখল, অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবহার ও তদারকির অভাবে সেই পরিকল্পিত পরিবেশ এখন বিলীন হওয়ার পথে।
ওয়ারীর বাসিন্দা আমিমুল ইসহান আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত এলাকায় এই পার্কটি সাধারণ মানুষের জন্য নির্মল বায়ু আর অবসরের জায়গা ছিল। আগে মানুষ নির্দ্বিধায় প্রবেশ করতে পারত, এখন পদে পদে টাকা লাগে। পার্কের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে যাচ্ছে”।
আড়ত ও ইজারার নেপথ্যে : পার্কের ভেতরে পশ্চিম-উত্তর ও পশ্চিম-দক্ষিণ অংশে রয়েছে দুটি মসজিদ। পশ্চিম-দক্ষিণ অংশে ফলের আড়তের ঠিক সামনেই ২০০০ সালে ১০ কাঠা জায়গায় নির্মিত ‘গুলিস্তান সেন্ট্রাল জামে মসজিদ’। তবে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক দাবিদার মো. ইউনুস বলেন, “মসজিদের পেছনে থাকা ফলের আড়তের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পার্কের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমেই এটি পরিচালিত হচ্ছে”।
পার্কের উত্তর-পশ্চিম অংশে রয়েছে ১৯৯৯ সালে নির্মিত দুই তলা বিশিষ্ট ‘স্কয়ার পাতাল মার্কেট মসজিদ’। সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, পার্কের ভেতরে এই ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণে ডিএসসিসির কোনো পূর্বানুমতি নেওয়া হয়নি। বর্তমানে পার্কের ভেতর গুলিস্তান নাট্যমঞ্চের নির্মাণকাজ চলছে এবং পাশেই রয়েছে একটি পাবলিক টয়লেট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর পার্কটির ইজারা নেন ৩৮নং ওয়ার্ড বিএনপির নেতা শেখ নিয়াজ মোর্শেদ (জুম্মন)। তবে ভ্যাটের টাকা জমা না দেওয়ায় ডিএসসিসি তাকে এখনও কার্যাদেশ দেয়নি। অথচ তিনি সিটি করপোরেশনের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে খাস আদায়ে যুক্ত রয়েছেন।
পার্কের ভেতরে অননুমোদিত বাণিজ্যিক রাইড পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে নিয়াজ মোর্শেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “পার্কটি এখন পুরোপুরি সিটি করপোরেশন পরিচালনা করছে। আমি শুধু খাস আদায়ে সহায়তা করছি। কার্যাদেশ পেলে নিয়ম মেনে পার্ক পরিচালনা করব”। লিচুর আড়ত প্রসঙ্গে তার দাবি, মৌসুম এলেই সেখানে অস্থায়ীভাবে জায়গাটি ব্যবহার করা হয়।
উচ্ছেদের পর ফের দখল, নির্বিকার নগরভবন : পার্কের উত্তর-পশ্চিম কোণের ১৫০০ স্কয়ার ফিট পরিত্যক্ত জায়গাটি দীর্ঘদিন অবৈধ দখলে ছিল। সম্প্রতি সেখানে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জায়গাটি দখলমুক্ত করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু কোনো সীমানাপ্রাচীর না দিয়ে জায়গাটি অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখায় আবারও টিনের বেড়া তুলে তা দখলের চেষ্টা করছে একটি চক্র। অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদ অভিযানের খবর আগেই চক্রটির কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সাময়িকভাবে মালামাল সরিয়ে নিলেও অভিযান শেষে তারা ফের জায়গাটি দখল করে।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এ সব বিষয়ে বেখবর খোদ সিটি করপোরেশন। ডিএসসিসির অঞ্চল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির আহমেদ এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, পার্কের মধ্যবর্তী পাবলিক টয়লেটটি তাদের বিভাগের মাধ্যমে সংস্কার হচ্ছে না। কারা সেখানে টিনের বেড়া দিয়েছে, সেটিও তার জানা নেই।
অথচ এই অব্যবস্থাপনার মধ্যেই গত ১৩ জুন পার্কে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যেসব পার্ক বা উন্মুক্ত স্থান ইজারা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো বাণিজ্যিক বা অস্থায়ী স্থাপনা রাখা যাবে না। শর্ত ভঙ্গ করা হলে লিজ বাতিল করা হবে”।
প্রশাসকের এমন কঠোর বার্তার পরও পার্কজুড়ে অবৈধ স্থাপনা ও বাণিজ্যিক দখলদারত্ব চলছে বহাল তবিয়তে। ফলে জনগণের করের টাকায় আধুনিকায়ন করা এই পার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখনই কঠোর তদারকি না বাড়ালে অচিরেই পার্কটি তার অস্তিত্ব হারাতে পারে।