× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড

একক ‘রাজত্ব’ ইমনের

তানভীর হাসান ও নূর মোহাম্মদ মিঠু

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬ ০৮:২০ এএম

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬ ০৮:২০ এএম

পুরান ঢাকা থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও তার বাহিনী। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পুরান ঢাকা থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও তার বাহিনী। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে বড় ধরনের ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটেছে নীরবে, নিঃশব্দে। পুরান ঢাকা থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও তার বাহিনী। রাজধানীর অপরাধ মানচিত্রে যেসব নাম একসময় আধিপত্যের প্রতীক ছিল, তাদের কেউ নিহত, কেউ পলাতক, কেউ আবার প্রভাব হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে ইমনের নাম। অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এ তথ্য মিলেছে।

ইমন অবস্থান করছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। কিন্তু মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন যোগাযোগ ও বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালনার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজধানীর একেবারে মাঠপর্যায় পর্যন্ত অপরাধীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। চাঁদাবাজি থেকে এলাকার বিভিন্ন দখলবাজিÑ সব বিষয়েই এই সন্ত্রাসীদের কাছে নির্দেশনা আসছে দুবাই থেকে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিবহন খাত, বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গুদাম ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইমনের কোটি টাকার চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকা, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বছিলা, ধানমন্ডি থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় সক্রিয় রয়েছে ইমনের প্রভাববলয়। ব্যবসায়ী ও নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইমনের স্থানীয় সহযোগীদের সঙ্গে নির্ধারিত ‘সমঝোতা’ ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা কিংবা নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব। ভয়, প্রতিশোধ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অধিকাংশ ভুক্তভোগীই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হন নি।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও ও হাজারীবাগ এলাকায় যে সন্ত্রাসী বলয়ের উত্থান ঘটেছিল, সময়ের ধারাবাহিকতায় তাতে নানা মেরুকরণ ঘটেছে, দুর্বত্তদের নাম ও নেতৃত্ব বদলেছে, গ্রুপ বদলেছে, কিন্তু আধিপত্যের লড়াই থামেনি। সেই লড়াইয়ে কেউ খুন হয়েছেন, কেউ কারাগারে গেছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন। তবু আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার করিডোরে ক্ষমতার খেলা রয়েছে অব্যাহত। আর সেই খেলায় বর্তমানে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন ইমনÑ এমনটাই দাবি অপরাধ জগতের একাধিক সূত্রের।

মামুন হত্যার পর বদলেছে আধিপত্যের সমীকরণ

আন্ডারওয়ার্ল্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ইমনের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তারিক সাঈদ মামুন পরবর্তী সময়ে তার অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে। একপর্যায়ে গত বছরের ১০ নভেম্বর ঢাকার আদালতপাড়ার ন্যাশনাল হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মামুনকে। দিনের আলোয় সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা ছিল না; আন্ডারওয়ার্ল্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামুন খুনের ঘটনা ছিল রাজধানীর অপরাধ জগতে আধিপত্য ও ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ার ঘটনা।

একাধিক সূত্রের দাবি, মামুনের মৃত্যুর পর তার নিয়ন্ত্রিত বলয়ে দ্রুত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ইমন বাহিনী। যেসব এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব ছিল, সেগুলোতে নতুন করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসেন ইমনের অনুসারীরা। মামুন হত্যার কয়েক মাসের মাথায় ঘটে আরেক আলোচিত হত্যাকাণ্ড। গত ২৮ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। প্রায় দুই দশক কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু টিটনের প্রত্যাবর্তন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। প্রকাশ্যে তিনি প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়েছেন বলে প্রচার থাকলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে রয়েছে নানান কথা। কারণ টিটন শুধু সহযোগীই ছিলেন না, তিনি ইমনের শ্যালকও। তাই হত্যাকাণ্ডটিকে ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে। এই খুনের মামলায় আসামি করা হয় অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালকে। যদিও পিচ্চি হেলালের দাবি, জেল থেকে বের হওয়ার পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। তবে ইমন তাকে পথের কাঁটা মনে করে টিটন হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় পিচ্চি হেলালের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক সূত্রের দাবি, টিটনের পুনরুত্থান ইমনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছিল। তার পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রচেষ্টা অপরাধজগতে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারেÑ এমন ধারণা থেকেই খুন হন টিটন।

পিচ্চি হেলালকে ঘিরে নতুন সমীকরণ

টিটন খুনের মামলায় কৌশলে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের নামও যুক্ত করেন ইমন। সেই মামলার পর থেকে এখনও এলাকাছাড়া হেলাল। আন্ডারওয়ার্ল্ড সূত্রের দাবি, টিটন হত্যা মামলায় হেলালের নাম অন্তর্ভুক্ত করে কার্যত তাকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। যার সুফল পেয়েছেন ইমন। সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘদিনের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করতে টিটন খুনের ঘটনাটি ব্যবহার করেছেন তিনি। এতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার প্রভাব আরও সুসংহত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইমন তার বাহিনী দিয়ে মাসে ৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে। টিটন হত্যায় আমাকে ফাঁসিয়ে এলাকা ছাড়া করেছে। এখন পুরান ঢাকা থেকে গাবতলী পর্যন্ত পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ইমন।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মামুন হত্যাকাণ্ড, টিটনের মৃত্যু ও পিচ্চি হেলালের এলাকা ছাড়ার ঘটনা আলাদা হলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে এগুলোকে একই ক্ষমতার লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এতে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে উঠে এসেছে ইমনের নাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্মাণাধীন ভবন, পরিবহন খাত, বাজার, গুদাম, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জাল। এসব খাত থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে না চাইলেও পর্দার আড়ালে সবাই জানেন, কোন এলাকায় কার প্রভাব ও কার অনুমতি ছাড়া কী ধরনের কাজ করা কঠিন। ফলে নীরব আতঙ্কই হয়ে উঠেছে ইমন বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের একের পর এক পতনের পর বর্তমানে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে ইমন গ্রুপ। তবে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাস বলছে, কোনো আধিপত্যই চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতার শূন্যতা যেমন নতুন রাজা তৈরি করে, তেমনি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীরও জন্ম দেয়।

গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঢাকায় শতাধিক প্রশিক্ষিত ক্যাডার রয়েছে ইমনের। তারা নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সব ধরনের কাজ করে থাকে। ওই ক্যাডারদের একটি তালিকা করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেসব চিহ্নিত সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়েছে বা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের নজরদারি ও অভিযান চলমান রয়েছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে ভারত থেকে ফেরত আনা ঢাকার আট শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন ছিলেন ইমন। ওই সময় পুলিশ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর থেকে দীর্ঘ সময় কারাগারে অবস্থান করেও সে খুনোখুনি, চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করত। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডসহ মোট ৩৩টি মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের বছরের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে ইমন নতুন করে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকে। বর্তমানে দুবাইয়ে বসে তার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা