প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৭ পিএম
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩৫ পিএম
ঢাকা-১৩ আসনে সুশৃঙ্খলভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক ধীরগতির ভোটার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনের ভোটগ্রহণ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ বিকাল পর্যন্ত বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শেষ হয় বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
সকালের লাইন্স অগ্রগতি শিক্ষা নিকেতন হাইস্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের আনাগোনা মাত্র শুরু হয়েছে। কেন্দ্রের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও ভেতরে ও বাইরে তেমন ভিড় ছিল না। ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল।
কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নিজ নিজ কক্ষে প্রস্তুত অবস্থায় বসে আছেন। ব্যালট পেপার, সিল, ভোটার তালিকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। সকাল বাড়লেও ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।
দায়িত্বে থাকা এক পোলিং অফিসার বলেন, “সময়সূচি অনুযায়ী ভোট শুরু হয়েছে। আমাদের সব প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন ছিল। এখন ভোটাররা ধীরে ধীরে আসছেন। বেলা বাড়লে হয়তো উপস্থিতি বাড়বে।”
সকাল থেকেই আগারগাঁও, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। শুরুতে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কয়েকজন প্রিসাইডিং অফিসার জানান, তখন পর্যন্ত ভোট পড়েছে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। অনেক কেন্দ্রেই পোলিং কর্মকর্তাদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ ও কাদেরিয়া তৈয়্যবা কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে দুপুরের দিকে ভোটারদের লাইন লক্ষ্য করা যায়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভোটাররা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যদিও একই কেন্দ্রের কয়েকটি বুথ ছিল প্রায় ফাঁকা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, সকালেই অনেক ভোটার ভোট দিয়ে চলে যাওয়ায় পরে কিছু বুথে চাপ কমে যায়।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন আয়েশা সিদ্দিকা। ভোট দিয়ে বের হয়ে তিনি বলেন, “এটা আমার জীবনের প্রথম ভোট। কিভাবে ভোট দিতে হয় সেটাও জানতাম না। কর্মকর্তারা সাহায্য করেছেন। নিজের হাতে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আমি চাই, আমার ভোটে দেশের জন্য ভালো সরকার গঠন হোক।”
নবীন ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ ছিল স্পষ্ট। তারা ভোটকেন্দ্রে এসে প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান, কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্যালট পেপার সংগ্রহ করে গোপন কক্ষে গিয়ে ভোট দেন। প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই ছিল স্মরণীয়।
ঢাকা-১৩ আসনের অন্তত ১৫টির বেশি কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কলোনি ও আবাসিক এলাকার কেন্দ্রগুলোতে সকালবেলায় উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। অনেক ভোটার দুপুরের পর কেন্দ্রে আসেন। কোথাও কোথাও পরিবার-পরিজন নিয়ে ভোট দিতে আসার দৃশ্যও দেখা গেছে।
তবে আগারগাঁও সংগীত কলেজ কেন্দ্রে কিছু ভোটারকে প্রার্থীর ছবি ও প্রতীকসংবলিত স্লিপ হাতে নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রিসাইডিং অফিসার মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, “এমন তো হওয়ার কথা না। কেউ এভাবে প্রবেশ করছে- এ তথ্য আমি পাইনি।” পরে বিষয়টি জানানো হলে সংশ্লিষ্টরা স্লিপ বিতরণ বন্ধ করেন বলে জানা যায়।
এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের পরিচয়পত্রে ছবি না থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও স্বাক্ষরবিহীন কার্ডও দেখা গেছে। তবে এসব বিষয় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেনি। কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে।
আগারগাঁও সংগীত কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন শেখ উজ্জ্বল। তিনি বলেন, “২০০৮ সালের পর এবার স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পারছি। ২০১৪ সালে আমি এজেন্ট ছিলাম। কিন্তু ভোট দিতে গিয়ে শুনি, আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবার নিজের হাতে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।”
আকরামুল হক বলেন, “আগে দেখা যেত ভোটার আর অ-ভোটার সবাই লাইনে দাঁড়াত। এতে বিশৃঙ্খলা হতো। কখনো মারামারিও লাগত। এবার সুশৃঙ্খলভাবে ভোট হচ্ছে, এই সমস্যাটা আর দেখলাম না।”
কাদেরিয়া তৈয়্যবা কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী প্রিসাইডিং অফিসার আহমেদুল ইসলাম জানান, “এখন পর্যন্ত ভোটগ্রহণ সুশৃঙ্খল। কোনও বড় অভিযোগ পাইনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় আমরা দায়িত্ব পালন করছি।”
নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা
ঢাকা-১৩ আসনের প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী কেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কেন্দ্রের আশপাশে সব ধরনের প্রচার বন্ধ রাখা হয়।
ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর ব্যালট পেপার প্রদান, নির্ধারিত প্রতীকে সিল প্রদান এবং গোপন কক্ষে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ভোট শেষে ব্যালট বাক্স সিলগালা করে নির্ধারিত কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়।
কেন্দ্রগুলোর বাইরে অতিরিক্ত ভিড় বা জটলা দেখা যায়নি। ভোটকেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে কোনো প্রার্থীর প্রচারের কার্যক্রম চোখে পড়েনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক দৃষ্টি রাখেন যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-১৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯ হাজার ৮১২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮ জন।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ববি হাজ্জাজ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. মামুনুল হক (১০ দলীয় জোট সমর্থিত), গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী মিজানুর রহমান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আপেল প্রতীকের প্রার্থী ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা (কলস প্রতীক), স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম (ঘুড়ি প্রতীক) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত মই প্রতীকের প্রার্থী খালেকুজ্জামান।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই আসনে সকালবেলায় ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলক কম থাকলেও দিনের শেষে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। তারা জানান, ভোটের ফলাফল নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ঘোষণা করা হবে।