ঢাকা-১৬
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০১ এএম
মিরপুরের স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার মতে, প্রকাশ্যে যা দেখা যাচ্ছে তা না-ও প্রতিফলিত হতে পারে। এখানকার রাজনীতিতে ‘নীরব ভোট’ নতুন কোনো বিষয় নয়।
ঢাকা-১৬ সংসদীয় আসন। রাজধানীর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এই আসনটিতে পরিকল্পিত আবাসন, পুরনো গ্রাম, শিল্পাঞ্চল ও দ্রুত নগরায়ণের এক জটিল সংমিশ্রণ স্পষ্ট। মিরপুরের একাংশ, রূপনগর, পল্লবী ও কালশী এলাকার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই আসনটি বহু বছর ধরেই ঢাকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। তবে নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছেÑ এখানকার ভোটের অঙ্ক সহজ নয়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রকাশ্য মিছিল-মিটিংয়ের চেয়ে এই আসনে চলছে নীরব হিসাব-নিকাশ। ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন। আবার অনেকের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ক্ষোভ, অনাস্থা ও রাজনৈতিক ক্লান্তির সুর। সব মিলিয়ে দৃশ্যমান উত্তাপের চেয়ে অদৃশ্য টানাপড়েনই বেশি চোখে পড়ছে। এর মধ্যেও আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর। যে কারণে তাদের কাছে টানতে দুই প্রার্থী ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করছেন।
ঢাকা-১৬ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিএনপির প্রার্থী ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক মো. আমিনুল হক একজন পরিচিত মুখ। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক হওয়ায় দলীয় কাঠামো ও ব্যক্তিগত পরিচিতির সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল বাতেন তুলনামূলকভাবে ভোটারদের কাছে কম পরিচিত। তবে সংগঠনের শক্তি ও নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি ভোটের সমীকরণে প্রভাব রাখার চেষ্টা করছেন।
এ আসনের রাজনীতিতে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলোÑ আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ নীরবে বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হকের পক্ষে কাজ করছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। তারা মূলত এই আসনের ঐতিহ্যবাহী মিরপুরের মোল্লাহ পরিবারের সন্তান ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দীন মোল্লাহর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে জামায়াত প্রার্থীও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট আদায়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রার্থীদের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।
উন্নয়ন আছে, কিন্তু ছোঁয়া লাগে না জীবনে
ঢাকা-১৬ আসনের প্রধান সড়কগুলোতে চোখে পড়ে উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন উড়ালসড়ক, প্রশস্ত রাস্তা, নতুন নতুন ভবন। কিন্তু অলিগলিতে ঢুকলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। পরিকল্পিত নগরায়ণের আড়ালে রয়ে গেছে দৈনন্দিন জীবনের বহু পুরনো সংকট।
পল্লবীর একটি বস্তি এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক আবদুল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাস্তা বড় হইছে, কিন্তু আমাদের জীবনে কী হইছে? ভাড়া বাড়ে, বাজার বাড়েÑ ভোট দিলে কী বদলায়, বুঝি না।
রূপনগরের গৃহিণী শিউলি বেগমের অভিযোগ, পানি আর ড্রেনের সমস্যা বছরের পর বছর বলি। নেতা আসে ভোটের আগে, পরে আর দেখা নাই। উন্নয়ন প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও তার সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছেÑ এমন বিশ্বাস অনেকের মধ্যে নেই।
ভোটারদের আগ্রহ কম হিসাব বেশি
সরেজমিন কথা বলা এই আসনের অধিকাংশ ভোটারই সরাসরি কোনো প্রার্থীর নাম বলতে অনিচ্ছুক। তবে কৌশলে বলছেন, দেখি কে আসে, কী বলে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনি আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।
পল্লবীর একটি কলেজের সামনে কথা হয় স্নাতক পড়ুয়া মাহিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “চাকরি নাই, স্কিল নাইÑ এই কথাগুলো কেউ বলে না। শুধু ব্যানার-ফেস্টুন আর স্লোগান। তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করছে, নির্বাচনি ভাষণে তাদের বাস্তব সংকটের প্রতিফলন নেই।”
অন্যদিকে বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে রয়েছে অভিজ্ঞতার ভার। মিরপুরের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, “ভোটের পরিবেশ যদি ঠিক থাকে, তবেই মানুষ উৎসাহ পাবে। না হলে মানুষ ঘরে বসেই থাকবে।”
গ্রহণযোগ্যতায় কে এগিয়ে : ঢাকা-১৬ আসনে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী দলীয় সংগঠনই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা। বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ চালালেও অনেকের ধারণা, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ই এখানে বড় ফ্যাক্টর।
তবে মিরপুরের স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার মতে, এই আসনে নীরব ভোট খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্যে যেটা দেখা যাচ্ছে, ফলাফলে সেটা না-ও প্রতিফলিত হতে পারে। এখানকার রাজনীতিতে ‘নীরব ভোট’ নতুন কোনো বিষয় নয়। আগের নির্বাচনগুলোতেও শেষ মুহূর্তে ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে দেখা গেছে।
সরেজমিন উঠে এসেছে কয়েকটি প্রধান স্থানীয় ইস্যুÑ বর্ষায় জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও পানির সংকট, বেকারত্ব ও অনিরাপদ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজি। বিশেষ করে মাদক নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ প্রবল। নাম প্রকাশ না করে কালশী এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভোট চাইলে এসব কথা শোনাতে হবে। শুধু জাতীয় কথা বললে হবে না।
ভোটের দিনই উত্তর
ঢাকা-১৬ আসনে এখনও উৎসবমুখর নির্বাচনি আমেজ চোখে পড়ছে না। ব্যানার ও ফেস্টুন থাকলেও উচ্ছ্বাস কম। ভোটাররা যেন অপেক্ষায়Ñ পরিবেশ, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মিল দেখার।
ভোটের দিনই জানা যাবে, এই নীরবতার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রত্যাশা কোন দিকে মোড় নেয়। ঢাকার এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের ফলাফল শুধু একটি আসনের নয় বরং নগর ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।
ভোটার সংখ্যা ও প্রার্থী
২০২৬ সালের হালনাগাদ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৩, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনটি। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১ হাজার ১৬৮ জন, নারী ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৩ জন ও তৃতীয় লিঙ্গ (হিজড়া) ৮ জন।
অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী হলেনÑ বাংলাদেশ লেবার পার্টির আলহাজ একেএম. মোয়াজ্জেম হোসেন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট: মো. আব্দুল কাদের জিলানী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. তারিকূল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) মো. নাজমুল হক, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) মো. মামুন হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মো. রাশিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি: মো. সুলতান আহম্মেদ সেলিম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মোহাম্মাদ তৌহিদুজ্জামান।