নির্বাচনী আসন ঢাকা-৯
মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৫০ এএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৫১ এএম
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
খিলগাঁও, মুগদা, সবুজবাগ ও মান্ডা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৯ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ১৮২নং আসনটিতে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এই আসনকে নিরাপদ, গণতান্ত্রিক এবং উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এলাকায় মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬০ জন। নারী ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৮২ জন। স্থানীয়দের অভিমত, এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকের হাবিবুর রশীদ হাবিব, স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের ডা. তাসনিম জারা, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী জাবেদ রাসিনের মাঝেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তারা বলছেন, এবারের ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবেন এলাকার তরুণ এবং প্রথম ভোটাররা। তবে রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেষ মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলাদা অবস্থান এ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জটিল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে এ আসনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গলসহ ছোট-বড় ১২টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
ঢাকা-৯ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন সরব হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দলীয় সমীকরণে আসে বড় পরিবর্তন। বিএনপি শেষ মুহূর্তে দলীয় প্রার্থী পরিবর্তন করে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও শেষ মুহূর্তে জোট গঠনের মাধ্যমে আসনটি ছেড়ে দেয় এনসিপিকে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করে ডা. তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন। জোটের কারণে সরে দাঁড়ান খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. ফয়েজ বখশ সরকার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসবই ভোটের অঙ্ক পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। যা জামায়াত-সমর্থিত ভোটারদের একটি অংশকে ফেলেছে দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
সরেজমিন খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা ও মান্ডা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব সূচকেই কিছুটা এগিয়ে আছেন বিএনপি প্রার্থী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব। শুরুতে তার নাম আলোচনায় না থাকলেও দলীয় প্রতীক পাওয়ার পর তিনি মাঠে সক্রিয় হন। নিয়মিত গণসংযোগ, পাড়া-মহল্লায় সভা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন তিনি।
অন্যদিকে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা ডা. তাসনিম জারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়ে ভোটের চিত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি ক্লিন ইমেজ, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক নগরব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী ও তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এদিকে এনসিপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া এবং জামায়াত জোটের প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া (জাবেদ রাসিন) ইতোমধ্যে প্রতিটি ওয়ার্ডে সরেজমিন ঘুরে সাধারণ মানুষের সমস্যা জানার চেষ্টা করছেন। ফলে এই আসনে নির্বাচনী মাঠে এনসিপির সাবেক ও বর্তমান দুই নেতা এখন মুখোমুখি।
ঢাকা-৯ আসন রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সরেজমিনে দেখা যায়Ñ খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা, মান্ডা এলাকায় মোড়ে মোড়ে ঝুলছে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যানার। তবে নির্বাচন নিয়ে পাড়া-মহল্লায় তেমন শোরগোল নেই। তালতলা মার্কেটের পাশে কথা হয় আব্দুল মালেকের সঙ্গে। দোকান কর্মচারী মালেক বলেন, ‘মুগদা-মানিকনগর ও মান্ডা এলাকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। মুগদা হাসপাতালের সামনের প্রধান সড়ক এবং ওয়াসা রোড দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে কার্যত অচল। এসব সমস্যার সমাধান যে করবে, তাকেই ভোট দেব।’
খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগের বাসিন্দা ভ্যানচালক সালাম মিয়া বলেন, ‘অনেক প্রতিশ্রুতি শুনছি, কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কারও দেখা পাওয়া যায় না। এলাকায় যে থাকবে, সুখে-দুঃখে যাকে পাশে পাওয়া যবে, তাকেই ভোট দেব।’
খিলগাঁও মডেল কলেজের সামনে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন ভদ্রলোকের সাথে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ভদ্রলোক বলেন, ‘রাস্তা, ড্রেনেজ আর যানজটÑ এই তিনটিই এ এলাকার প্রধান সমস্যা। যিনি এগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন, এবারের নির্বাচনে তিনিই এগিয়ে থাকবেন।’ আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেন, তবে ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী তাসনিম জারাও ভালো করছেন বলে মন্তব্য করেন।
খিলগাঁও, মুগদা, সবুজবাগ এলাকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। এ বিষয়ে স্থানীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসায়ী মো. ফরিদ বলেন, ‘বাসাবো ঝিলপাড়সহ কিছু এলাকায় গ্যাসের সংকট রয়েছে এবং গ্যাসের পাইপে পানি জমে থাকে। বাসাবো প্রধান সড়ক হতে নন্দীপাড়া সড়কটিও বেহাল, এই সড়কের জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।’
নন্দীপাড়ার বাসিন্দা খিলগাঁও মডেল কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ইভা ও মিম জানান, ‘বাসাবো থেকে নন্দীপাড়াগামী নাজুক অবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।’ বাসাবো এলাকার গৃহিণী ফরিদা বেগম বলেন, ‘রাস্তার সংস্কার, টেম্পুস্ট্যান্ড সরানো এবং যানজট কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
নির্বাচন নিয়ে ডা. তাসনিম জারা সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিকশাচালক, দিনমজুরসহ সব খাতের শ্রমিকদের প্রধান চাওয়া নিরাপদ পরিবেশ ও ন্যায্য আয়ের সুযোগ।’ সংসদে গেলে এই শ্রেণির মানুষের হয়ে কথা বলার অঙ্গীকার করেন তিনি।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ড্রেন ও সড়ক সংস্কার, মাদক নির্মূল, গ্যাস সংকটসহ এলাকায় যেসব সমস্যা রয়েছে তার অনেক কিছু সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় যা-ই হোক, গত ৩৮ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সব সময় মানুষের পাশে ছিলাম এবং থাকব।’
দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ঢাকা-৯ আসনের ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ অনেক বেশি। তবে বারবার প্রার্থী বদল হওয়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ। পছন্দের প্রার্থী সরে যাওয়ায় অনেকেই নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার কথাও ভাবছেন। এদিকে প্রার্থীরাও ভোটারদের দরজায় দরজায় গিয়ে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। সব মিলিয়ে জমে উঠেছে ঢাকা-৯ আসনের নির্বাচনী লড়াই। তবে জয়-পরাজয় নির্ধারণে ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং প্রার্থীর ইমেজ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘমেয়াদি সমীকরণেও তৈরি হয়েছে এক কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত।