মাহরিব বিন মহসিন, ঢাবি
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৫৩ পিএম
আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫৩ পিএম
বিশ্বের বৃহত্তম সরস্বতী পূজার আয়োজনে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিদ্যার দেবী ও শুদ্ধতার প্রতীক সরস্বতীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার সারাদেশে উদ্যাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা।
জ্ঞান ও সুরের দেবীর এই আরাধনায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হল।
আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যক মণ্ডপ ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে এই হলের পূজা বিশ্বের বৃহত্তম সরস্বতী পূজা আয়োজন হিসেবে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মণীষায় দেবী সরস্বতী কেবল একজন ধর্মীয় সত্তা নন, বরং বিদ্যা, শিল্পকলা ও শুভ্রতার প্রেরণা।
প্রাচীন তান্ত্রিক প্রথায় দেবী ‘বাগেশ্বরী’র আরাধনার যে রূপ দেখা যেত, তা আধুনিককালে এসে একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ লাভ করেছে। ঢাবির জগন্নাথ হলে এই উৎসবের ব্যাপ্তি এখন বিশ্বজনীন।
এ বছর হলের সুবিশাল খেলার মাঠ এবং উপাসনালয় প্রাঙ্গণ মিলিয়ে সর্বমোট ৭৫টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩টি মণ্ডপ পরিচালনা করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। বাকি দুটি মণ্ডপের একটিতে হল প্রশাসন ও অপরটিতে হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যোগে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শরতের শ্বেতশুভ্র কাশফুলের মতো দেবীর প্রতিমাগুলোতে ফুটে উঠেছে পবিত্রতার আভা। প্রতিটি বিভাগ তাদের সৃজনশীলতা ও স্থাপত্যশৈলীর মাধ্যমে একেকটি মণ্ডপকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছে।
মাঠের চারদিকে আলোকসজ্জার বর্ণিল আভা এবং ধূপের গন্ধে এক স্বর্গীয় আবহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও এই আয়োজন ঢাবির বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রাণের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও এই উৎসবে শামিল হয়েছেন।
প্রতিবারের ন্যায় এবারেও আয়োজনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো জগন্নাথ হলের পুকুরের মাঝখানে স্থাপিত সুবিশাল সরস্বতী প্রতিমাটি। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের শ্রম ও শৈল্পিক দক্ষতায় নির্মিত এই প্রতিমাটি উচ্চতা এবং নান্দনিক বিন্যাসে দর্শনার্থীদের বিমোহিত করছে।
বাঁশ, বেত ও পাটের মতো দেশজ উপকরণের শৈল্পিক ব্যবহারে দেবীর এই রূপটি কেবল ধর্মীয় প্রতিমা নয়, বরং একটি উচ্চমানের শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া, প্রতিবছর পূজার দিন হলের মাঠে মেলা বসে। যেখানে স্টল নিয়ে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সহ বিভিন্ন নামীদামী প্রতিষ্ঠান। এই মেলায় মুখরোচক খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিসের দেখা মেলে।
পূজার দিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ছুটে আসেন এখানে। অসংখ্য মণ্ডপের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী—সবকিছু মিলিয়ে এটিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সরস্বতী পূজা দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জগন্নাথ হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) পল্লব চন্দ্র বর্মন জানান, "জগন্নাথ হলের এই পূজা কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং গুণগত মানেও অনন্য।”
তিনি বলেন, ‘আমাদের হলের পূজা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং সারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ সরস্বতী পূজা। আমরা এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নথিভুক্ত করার লক্ষে কাজ করছি।
আমাদের বিশ্বাস, এই স্বীকৃতি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে পরিচিত করবে।’
তিনি জানান, ‘ডাকসু নির্বাচনের পর হল সংসদ দায়িত্ব পাওয়ায় পূজা আয়োজন নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করা হচ্ছে। পূজার পরদিন একটি কনসার্টসহ আরও বেশ কিছু চমকপ্রদ আয়োজন থাকছে।’
অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ এবং পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক দেবাশীষ পাল বলেন, "আমরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পূজা আয়োজনের চেষ্টা করেছি। লটারির মাধ্যমে মণ্ডপের স্থান নির্ধারণ থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি উপ-কমিটির মাধ্যমে সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানবিক সেবার অংশ হিসেবে রক্তদান কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়েছে।"
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি জানান, ‘পুরো জগন্নাথ হল এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে। প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টরসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপদ কর্নার স্থাপন করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের পটকা বা আতশবাজি ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ স্টিকার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।’