× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাকরাইনে বর্ণিল ঢাকার আকাশ

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৫ এএম

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৩ এএম

পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসবে (পৌষ-সংক্রান্তি) লাল-নীল-সাদা-সবুজসহ নানা রঙের ঘুড়িতে রঙিন হয়ে ওঠে উন্মুক্ত গগন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসবে (পৌষ-সংক্রান্তি) লাল-নীল-সাদা-সবুজসহ নানা রঙের ঘুড়িতে রঙিন হয়ে ওঠে উন্মুক্ত গগন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা আড়াই হাজার বছরেরও বেশি বয়সি জনপদ ঢাকা। বর্তমানে তিলোত্তমা এই রাজধানীর প্রাচীনতম অংশ পুরান ঢাকার অলিগলি খুবই সরু ও অপ্রশস্ত। দুই পাশের বাড়িগুলো একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়ানো বোঝার উপায় নেই একটা নাকি কয়েকটা বাড়ি। এর মধ্যে কোনো কোনো বাড়ি জরাজীর্ণ, সেসব বাড়ির কার্নিশ-দেয়াল বেয়ে বেড়ে উঠেছে বিভিন্ন লতাগুল্ম, এমনকি অশ্বত্থও। এমনই পরিবেশে সূর্যস্নাত পৌষের শেষ দিনের দুপুর গড়িয়ে যেতেই চারদিকে হৈহৈ রব। সরু গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আসমানের দিকে তাকাতেই রঙের ঝটকা; লাল-নীল-সাদা-সবুজসহ নানা রঙের ঘুড়িতে রঙিন হয়ে উঠেছে উন্মুক্ত গগন। হঠাৎ একটি বাড়ির ছাদে থেকে ভেসে এলো উল্লাসধ্বনি একটা ঘুড়ি কেটেছি; একটা ঘুড়ি কেটেছি।

ভেসে আসা উচ্ছ্বাসের প্রতি মনঃসংযোগ দিয়ে গলির মাঝখানে দাঁড়াই। আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকি অজানা নাটাই থেকে ঘুড়ির বিছিন্ন হওয়ার দৃশ্য। চেষ্টা করি, যার হাতের নাটাই থেকে ঘুড়ি বিছিন্ন হয়েছে তার অভিব্যক্তি শুনতে বা দেখতে। হঠাৎ একটা রিকশার বেলের শব্দ; সঙ্গে রিকশাওয়াল বলে ওঠে মামা, সাইড দেন। আজ সাকরাইন উৎসব; পুরান ঢাকার সব ছাদ থেকেই ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। একটু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখুন। ইতস্ততার সঙ্গে সরে দাঁড়াতেই দেখি আমারই মতো একজন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সরু রাস্তার পাশের চিকন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। পরিচয় জানতে চাইলে জানান তার নাম সজীব। পুরান ঢাকায় তার জন্ম-বেড়ে ওঠা। সবাই ছাদে থেকে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে; তিনি একটা কাজে বের হয়েছেন; বাসায় পিঠাপুলির আয়োজন আছে কয়েকটা ফানুস কিনতে হবে। ফিরে এসে বিকালের দিকে তিনিও ঘুড়ি ওড়াবেন।

এবারের সাকরাইন উৎসব বা পৌষ-সংক্রান্তি উৎসব কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে সজীব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটা পুরান ঢাকার নিজস্ব উৎসব। ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে সকলেই এই উৎসবের সঙ্গে যোগ দেয়; আনন্দ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে এবার কিছুটা ব্যত্যয় ঘটছে। ক’দিন ধরেই একটা গোষ্ঠী এলাকায় মাইকিং করছে যেন এবার পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে কোনো গান-বাজনা না হয়; এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না; ইত্যদি ইত্যাদি। যে কারণে গত বছরের মতো এবারও কিছুটা নিরুৎসাহ আছে; অনেকেই উৎসব করছেন না।

কারা মাইকিং করেছে  জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিক কারা করছে এটা প্রশাসনও জানে। কিন্তু তারা কিছু বলছে না। আমরা কী বলব? জন্মের পর থেকে এই উৎসব করে আসছি; এটা আগের মতো উৎসাহ-উদ্দীপনায় না করতে পারলেও উৎসবের আয়োজন পুরোপুরি বাদ দেব না। 

কিছুক্ষণ পর শাঁখারি বাজারে কথা হয় পূর্বপরিচিত লোক সংস্কৃতি গবেষক ও সাংবাদিক ইমরান উজ-জামানের সঙ্গে। সাকরাইন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে চাপা পড়ে আছে ঢাকার গোড়াপত্তনের অজস্র জানা-অজানা ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। তবে কয়েকশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখনও টিকে আছে এই ‘সাকরাইন’ বা পৌষ-সংক্রান্তি উৎসব। এটা একেবারে পুরান ঢাকার নিজস্ব সাংস্কৃতিক এক ঐতিহ্য। উৎসবটি এখনও চলমান থাকলেও আগের সেই জৌলুস নেই। নানা কারণে নেই আগের মতো উচ্ছ্বাস; আনন্দ-হিল্লোল। তবে নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালের মধ্যে এই উৎসবটি হচ্ছে এটাই অনেক। শান্তিপ্রিয় এবং উৎসবপ্রিয় পুরান ঢাকার সাধারণ মানুষ এটা ধরে রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।

পুরান ঢাকা ঘুরে ঘুরে সাকরাইন উৎসবের ঘুড়ি ওড়ানো ও বিভিন্ন বাড়ির-ঘরের সাজসজ্জা দেখতে দেখতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। যে সন্ধ্যায় উপলব্ধি হলো কয়েক দিন ধরে দোর্দণ্ডপ্রতাপে সূর্যের দেখা মেলায় তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় কমেছে রাজধানীর প্রকৃতিতে শীত-কুয়াশার উপস্থিতি। যদিও পৌষের শেষ দিনে মধ্য দুপুরের পর থেকে সূর্যটা ছিল নিস্তেজ। ঢাকার আকাশ ছিল কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। আর এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশটাকে নানা রঙে বর্ণিল করে তুলেছিল পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী-সাকরাইন উৎসবের চোকদার, মাসদার, গরুদান, লেজলম্বা, চারভুয়াদার, পানদার, লেনঠনদার, গায়েলসহ নানা ধরণের বৈচিত্র্যময় ডিজাইন ও রঙের বর্ণিল ঘুড়ি। সন্ধ্যা হতেই এর সঙ্গে যুক্ত হয়Ñ আতশবাজি আর রঙবেরঙের ফানুস ওড়ানোর দৃশ্য। যার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্য আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করেন রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। সেই সঙ্গে ছিল নানারকম মুখরোচক পিঠাপুলিসহ পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন। এসব আয়োজনে ঐতিহ্যের অনুসন্ধানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা আনন্দ আর উদ্দীপনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যান।

পুরান ঢাকার ধূপখোলা, নারিন্দা ও গেন্ডারিয়াসহ অন্যান্য এলাকা ঘুরে এবার সাকরাইনের আয়োজনে কিছুটা কমতি পেলেও শাঁখারীবাজার এলাকায় জমজমাট উৎসবের দেখা মিলেছে। আয়োজন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গেন্ডারিয়ার এক বাসিন্দা বলেন, বহু বছর ধরে আমার বাবা-চাচারা ঘুড়ি উৎসব করে আসছেন। আমি নিজেও গত বছর আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু এবার মসজিদ কমিটি থেকে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ভাঙচুরের ভয়ে এবার তেমন জাঁকজমক করে আয়োজন করিনি।

প্রসঙ্গত, বাংলা ক্যালেন্ডারের দশম মাস পৌষের শেষ দিনে পৌষ-সংক্রান্তির সঙ্গে সাকরাইন উৎসব পালিত হয়। এই জন্য কেউ কেউ এটাকে পৌষ-সংক্রান্তি উৎসবও বলে। জানা যায়, সাকরাইন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ সংক্রাণ থেকে এসেছে। এর অর্থ বিশেষ মুহূর্ত। অর্থাৎ বিশেষ মুহূর্তকে সামনে রেখে পালিত সাকরাইন উৎসব পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করারও একটি উপলক্ষ। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা