ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সংলাপ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৯ পিএম
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও যমুনা টেলিভিশনের যৌথ আয়োজনে ‘দুর্নীতি কীভাবে কমবে’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতিকে একটি প্রধান উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন। গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে দেশের শীর্ষ পাঁচটি উদ্বেগের একটি হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতি। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও যমুনা টেলিভিশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘দুর্নীতি কীভাবে কমবে’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে সংস্থাটির সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফলে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
যমুনা টেলিভিশনে বুধবার এফসিডিও’র অর্থায়নে ‘বি-স্পেস” প্রজেক্টের আওতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আশরূপা হক চৌধুরীর সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সংলাপে বলা হয়, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের নভেম্বরের এক জরিপ অনুযায়ী দুর্নীতি দমন আগামী সরকারের জন্য ৪র্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জরিপে অংশগ্রহণকারীরা। একই জরিপে জানা যায়, একজন সংসদ সদস্যের কাছে ৩০ শতাংশ নাগরিকের প্রধান প্রত্যাশা জনস্বার্থে কাজ করা এবং ২৪ শতাংশ নাগরিকের প্রধান প্রত্যাশা সততা।
অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন বাংলাদেশ বর্তমানে ভুল পথে এগোচ্ছে এবং এর শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যেও দুর্নীতির উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি, আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একটি বড় অংশ। জরিপ অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ ভোটার এখনো ঠিক করেননি তারা কাকে ভোট দেবেন, যার মধ্যে ৪৩ ভাগই নারী।
এই প্রেক্ষাপটে সংলাপে অংশ নেওয়া ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল বলেন, “বর্তমান সময়টি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভোটাররা এখন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।”
সংলাপে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “পাসপোর্ট পেতে ৭৪ শতাংশ মানুষকে ঘুষ দিতে হয়। বিচার বিভাগ ও ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও দুর্নীতি চেপে বসেছে। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি কমানোর আশ্বাস দিচ্ছেন, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি জনগণের কাছে স্পষ্ট নয় “
দেশের বিদ্যমান আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনিক কাঠামো দুর্নীতিবান্ধব হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, “ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না। ক্ষমতা মানেই টাকা এই সংস্কৃতি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।”
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শামা ওবায়েদ বলেন, “বিএনপির ইশতেহারে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। বিচার বিভাগে দুর্নীতি বন্ধে আলাদা কমিশন গঠন, দুদকের সংস্কার, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন এবং টাকা পাচার বন্ধে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
“নির্বাচনে জয়ী হলে মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে নাগরিক জীবনের সংকট নিরসনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”
এ সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা ও রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বোচ্চ স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা শম্পা বসু। এছাড়াও, দলীয় আনুগত্যের আড়ালে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক তাহসিন রিয়াজ। তিনি বলেন, “তাদের দলে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আল মামুন রাসেল বলেন, “দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই দুর্নীতি বিস্তৃত। জবাবদিহিতা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয়।”
তিনি জানান, অনিয়মে যুক্তদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা করা হবে না।
সংলাপ শেষে বক্তারা একমত হন যে দুর্নীতি দমন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন বাস্তব সংস্কার, কার্যকর জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার দৃশ্যমান প্রতিফলন