রাজধানী
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৪ এএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত
কংক্রিটের শহর রাজধানী ঢাকা। দ্রুত বর্ধনশীল এ শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ নিত্যনৈমিত্তিক স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সম্প্রতি পর পর কয়েকটি ভূমিকম্পের পর ভবন নিরাপত্তা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এ অবস্থায় নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই ছাড়াই আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবনের নির্মাণকার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নগরবাসীর অভিযোগ অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এ বিষয়ে কার্যত নিস্ক্রিয় রয়েছে।
২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ভবনের একাধিক নকশা
প্রণয়ন ও অনুমোদনের বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তবে রাজউক ভবনের স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রিক্যাল
বা প্লাম্বিংÑ এসব গুরুত্বপূর্ণ নকশার অনুমোদন দেয় না। সংস্থাটি কেবল আর্কিটেকচারাল
বা স্থাপত্য নকশার অনুমোদনেই সীমাবদ্ধ। ফলে জমির ব্যবহার, সড়ক প্রস্থ, সেটব্যাক, পার্কিংÑ
এসব মানা হলেও কাঠামোগত নিরাপত্তা অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যাচাইয়ের বাইরেই রয়ে যায়।
মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, পাইলিং পরীক্ষা, কংক্রিট ও রডের মান যাচাইÑ
এসব তদারকিরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের নির্দেশনাও কাগজেই
সীমাবদ্ধ। তাই বাস্তবে মাননিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভবন মালিক ও তার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর
ওপর নির্ভরশীল।
২০২০ সালে প্রণীত জাতীয় বিল্ডিং কোডে শুধু আর্কিটেকচারাল বা স্থাপত্য
নকশা নয়, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সার্ভিস ড্রইং (বিদ্যুৎ, পানিপথ,
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভেন্টিলেশন), নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মানÑ সবকিছুর স্পষ্ট নির্দেশনা
রয়েছে। এই সার্ভিস ড্রইংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি সেবা কীভাবে ভবনে প্রবাহিত হবে তা নির্ধারিত
হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজউক এসব সার্ভিস ড্রইং যাচাই বা পরীক্ষার জন্য মাঠে আসে না।
২০২৩ সালে ওই কোডের প্রতিফলন ঘটাতে ইমারত বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ
নেওয়া হয়। কিন্তু এখনও সেই সংশোধন গেজেটভুক্ত হয়নি। ফলে আইন হাতে থাকলেও বাস্তবে এর
কার্যকারিতা দেখা যায় না। এ এক ধরনের ফাঁকÑ যেখানেই ভবন নির্মাণ হয়, নিয়ন্ত্রক নজরদারি
থাকছে না।
নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আধুনিক ব্যবস্থা যুক্ত হলেও বাস্তবে
তা কার্যকর হয়নি। কোথায় কত ভিম, কত কলাম, কোন গ্রেডের রড, কীভাবে ঢালাইÑ এসব নির্ধারণ
ও মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখনও শুধু মালিকপক্ষের। বহুতল ভবন নির্মাণের আগে মালিককে
একজন স্থপতি ও একজন প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে হয়। এরপর ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা
জমা দিতে হয় রাজউকে। তাতে লেখা থাকে, নিযুক্ত পেশাজীবীরা বাংলাদেশের জাতীয় বিল্ডিং
কোড অনুযায়ী নির্মাণকাজ তদারকি করবেন। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটালে রাজউক মাঠে গিয়ে রড,
কংক্রিট বা অন্যান্য সামগ্রী পরীক্ষা করতে পারে না। ল্যাব টেস্ট বা নিয়মিত ইন্সপেকশন
করা হয় না।
ফলে রাজধানীর বহুতল ভবনগুলো প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল বেসরকারি
প্রকৌশলীর ওপর। তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এই শহরে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই ছাড়াই প্রতিদিন
আকাশছোঁয়া দালান গড়ে উঠছে।
মালিক চাইলে স্ট্রাকচারাল নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান, কংক্রিট ঢালাইসহ
পূর্ণাঙ্গ কোয়ালিটি কন্ট্রোলের জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োগ দিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে
তা খুব কমই ঘটে। বালু, রড বা কংক্রিটের মান যাচাইয়ের জন্য ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক
হলেও নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা ও মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরোপুরি মালিক ও তার প্রকৌশলীর
ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রাজউক কেবল কাগুজে রিপোর্ট গ্রহণ করে; মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা বা
ল্যাব ও জনবল নেই।
রাজউকের নিজস্ব ভবন নির্মাণেও এই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। সংস্থাটি নিজ
ভবনের স্ট্রাকচারাল নকশাও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে করায়। কংক্রিট ও নির্মাণসামগ্রী
পরীক্ষা করতে হয় স্বীকৃত ল্যাবে। ফলে সরকারি সংস্থার নিজের জন্যও স্বনির্ভর মান যাচাইয়ের
সক্ষমতা নেই।
সব মিলিয়ে ভবন নিরাপত্তার দায়িত্ব জটিল চক্রে আটকে গেছে। রাজউক কেবল
নকশার অনুমোদন দেয়, স্ট্রাকচারাল মান নির্ধারণ করে না, মাঠে গিয়ে কংক্রিট পরীক্ষা করে
না। সংস্থার সক্ষমতার ঘাটতি পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক
ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজউক ভবন
নির্মাণের অনুমোদন দেয়। লিখে দেয় যাতে নিয়ম মেনে চলা হয়। কিন্তু ওই নিয়ম বাস্তবায়ন
হচ্ছে কি না, তা কেউ পরীক্ষা করে দেখছে না। আমরা অনেক বছর ধরেই বলছি, সংস্থাটির উচিত
ভবনের কোয়ালিটি কন্ট্রোল প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা। রাজউকের যদি নিজস্ব সক্ষমতা না থাকে,
তাহলে যেসব প্রকৌশল ফার্মের যথেষ্ট সক্ষমতা আছে, তাদের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো উচিত।
কিন্তু সংস্থাটি তা করছে না। ফলে নির্মিত ভবনগুলো নিরাপদ কি না তা নিশ্চিতভাবে জানা
যাচ্ছে না।’
নির্মাণাধীন ভবনের কোয়ালিটি ও গুণগত মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অত্যাধুনিক
যন্ত্রপাতি সংবলিত একটি আধুনিক ল্যাব রয়েছে রাজউকের। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরবান
রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ সালে রাজধানীর মহাখালীতে ল্যাব স্থাপন করা হয়, কিন্তু
এখনও তা ব্যবহারযোগ্য হয়নি। এই ল্যাবে ভবনের রড পরীক্ষা করার ১০টি স্ক্যানারের মধ্যে
৯টি এখনও খোলা হয়নি। মাটির গুণাগুণ যাচাইয়ের সিপিটি টেস্টার, কংক্রিট পরীক্ষার ক্যাপাটেস্ট,
পাইল মান নির্ণায়ক পাইল ইনটিগ্রিটি টেস্টার এবং আলট্রা পালস ভেলোসিটি মেশিনÑ সবই তালাবদ্ধ।
সরকার ল্যাবটি চালু করার জন্য আরবান সেফটি অ্যান্ড রিজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট
(ইউএসআরআই) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল
ইসলাম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইনস্টিটিউটটি একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত
হবে। আমাদের যেসব ইকুইপমেন্ট ও ভবন রয়েছে, সবই ট্রাস্টের অধীনে দেওয়া হবে। পাশাপাশি
কিছু সিড মানি দেওয়া হবে। সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। একটি ট্রাস্টি
বোর্ড গঠন করা হবে; যেখানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি থাকবে। তারা স্বাধীনভাবে সারা দেশে কাজ করতে
পারবে।’