× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পূর্বাচলে নতুন শহর ঘিরে আরেক ডিএমপি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৮ এএম

পূর্বাচলে নতুন শহর ঘিরে আরেক ডিএমপি

পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় অবকাঠামো ও জনবল সম্প্রসারণের প্রস্তাব এসেছে রাজধানীর অদূরে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকা ঘিরে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ প্রকল্প এলাকাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় এনে সেখানে ৪টি থানা, ৬টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্সসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পুলিশ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এই বিশাল কাঠামো পরিচালনার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ হাজার ৫২৪টি নতুন পদ সৃষ্টির। পুলিশের একক কোনো প্রকল্পে অবকাঠামো ও জনবল সম্প্রসারণের এত বড় পরিকল্পনা আগে আর কখনও করা হয়নি। কেউ কেউ পূর্বাচলের নতুন শহর ঘিরে পুলিশের এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে আরেক ডিএমপি হিসেবে বিবেচনা করছেন।

সরকার সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতের জনসংখ্যা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আবাসন প্রকল্প ও কূটনৈতিক অঞ্চল বিবেচনায় রেখে ‘আগাম প্রস্তুতি’ হিসেবেই সরকারের নীতি-নির্ধারকরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুলিশ অধিদপ্তর থেকে পাঠানো আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑ বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো সম্প্রসারণ, নতুন পদ সৃজন, তদন্তকেন্দ্র ও ফাঁড়ি স্থাপন এবং পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো গড়ে তোলা। বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় সুপারনিউমারারি অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল (গ্রেড-২) পদে ৫টি নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব রয়েছে। 

সভায় আরও বলা হয়Ñ নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ এখন পূর্বাভাসভিত্তিক পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে। সে কারণেই সরকার চায় নতুন শহর, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তবতায় পুলিশ বাহিনীকে আগেভাগেই প্রস্তুত করতে। তবে নতুন পুলিশের ইউনিট গঠনের বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু নিরাপত্তা পরিকল্পনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব চাপ ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ভবিষ্যতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের বসবাস হতে পারে। এখানে থাকবে সরকারি আবাসন, কূটনৈতিক এলাকা, আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক হাব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। এ কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখা থেকে প্রস্তাবনায় শুরু থেকেই এলাকাটিকে ডিএমপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে আধুনিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পূর্বাচলে অপরাধ প্রতিরোধ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জরুরি সাড়া এবং ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসঝুঁকি মোকাবিলায় এই বিশাল পুলিশ অবকাঠামো অপরিহার্য। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় পুলিশের জনবল কাঠামো অনুযায়ী, পুরো এলাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় আনতে প্রশাসনিক অনুমোদন আবশ্যক। 

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহরে গড়ে তোলা হবেÑ পুলিশের ১টি অপরাধ বিভাগ, ১টি গোয়েন্দা বিভাগ, ১টি ট্রাফিক বিভাগ, ১টি পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ১টি পরিবহন বিভাগ, ১টি পুলিশ লাইনস, ১টি এমআইএস/আইটি ইউনিট, ২টি অপরাধ জোন, ৪টি ট্রাফিক জোন, ৪টি থানা, ৬টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্স। এই বিশাল কাঠামোর জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাংগঠনিক কাঠামোতে ৬ হাজার ৫২৪টি নতুন পদ সৃজন এবং বিপুলসংখ্যক যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এলাকায় থাকবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত কমিশনার থেকে সহকারী কমিশনার), পরিদর্শক, উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শক, কনস্টেবল ও নায়েক। এ ছাড়াও থাকবে ট্রাফিক, গোয়েন্দা, নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্ক, সাইবার ও বিশেষায়িত ইউনিট। কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্রয় করা হবে পেট্রোল কার, মোটরসাইকেল, প্রিজন ভ্যান, সাঁজোয়া যান এবং আধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম। প্রস্তাবে সরাসরি মোট ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখ করা না হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, জনবল বেতন ও ভাতা বাবদ খরচ হবে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা। যানবাহন ও লজিস্টিকস, ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি ও নজরদারি ব্যবস্থা সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠবে দীর্ঘমেয়াদি। এজন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বাচল শুধু আবাসিক এলাকা নয়, এটি ভবিষ্যতের রাজধানীর বিকল্প কেন্দ্র। এখানে নিরাপত্তাজনিত কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না।


জেলা পর্যায়ে আরও নতুন তদন্তকেন্দ্র ও ফাঁড়ি হচ্ছে 

পূর্বাচলের পাশাপাশি কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও মুন্সীগঞ্জ জেলার একাধিক এলাকায় নতুন পুলিশ তদন্তকেন্দ্র ও ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯৬টির বেশি নতুন পদ সৃষ্টি, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যানবাহন এবং সীমান্ত ও জনঘনত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার সুলতানপুরে নতুন পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপন, ২২টি পদ সৃষ্টি ও ৫টি যানবাহন যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানাধীন শিমুল বাগানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং ২০টি পদ ও ৬টি যানবাহন অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সাতক্ষীরার ভোমরা এলাকায় ৩৪টি পদ ও ১৩টি যানবাহনসহ একটি বড় আকারের পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ি এবং বাগড়া ইউনিয়নে নতুন পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টিও আনা হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা ও সুনামগঞ্জে চোরাচালান, মাদক ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এসব ইউনিট কার্যকর হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশের কাজের পরিধি বহুগুণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সাইবার অপরাধ, মেট্রোপলিটন ব্যবস্থাপনাÑ সবকিছু সমন্বয় করতে শীর্ষ পর্যায়ে যেমন অতিরিক্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন, তেমনি ইউনিটও দরকার। তবে সবার আগে দেখতে হবেÑ দেশের বিদ্যমান থানাগুলো জনবল ও লজিস্টিকসের ঘাটতিতে ভুগছে কি না। কারণ দেশজুড়ে বহু থানায় এখনও গাড়ির সংকট, জনবল ঘাটতি, আবাসন সমস্যা ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা রয়েছে। তাই নতুন ইউনিট গঠনের পাশাপাশি বিদ্যমান থানা ও ফাঁড়িগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সরকারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কেবল পদ সৃজন নয়, প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।’

সূত্রমতে, প্রস্তাবনাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পর্যালোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যায়ভিত্তিক বাস্তবায়নের পক্ষে মতামত দিয়েছে। তবে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা এক দিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে না করলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়বে।’

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ বলেন, ‘নতুন থানা মানেই নিরাপত্তা বাড়বেÑ এই ধারণা সব সময় সঠিক নয়। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা না থাকলে বড় কাঠামোও অকার্যকর হতে পারে। পূর্বাচল প্রকল্পে পুলিশের এই বিশাল সম্প্রসারণ একদিকে যেমন ভবিষ্যৎ নগর নিরাপত্তার প্রস্তুতি, অন্যদিকে তেমনি এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার বড় পরীক্ষা।’

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এত বড় জনবল কি ধাপে ধাপে নেওয়া যেত না? তা ছাড়া বিদ্যমান থানাগুলোর উন্নয়ন কি উপেক্ষিত হচ্ছে? প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের দিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে? এসব নির্ভর করবে আগামী নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। পূর্বাচল শুধু নতুন শহর নয়Ñ এটি হয়তো হতে পারে নতুন ধরনের প্রশাসনিক মডেলের পরীক্ষাগার।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা