রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৪২ পিএম
ময়লার গাড়ি কেনা নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দরপত্র প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন তুঘলকি কাণ্ড সামনে এসেছে। একই সঙ্গে আহ্বান ও উন্মুক্ত করা তিনটি দরপত্রের একটিতে ভয়াবহ জালিয়াতির দায়ে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা হলেও, মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে একই প্রতিষ্ঠানকে বাকি দুটি বড় কাজে প্রায় সাড়ে ৩৫ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন, অন্যদিকে সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকেও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নথি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচটিএমএস লিমিটেডের বিরুদ্ধে পাঁচটি কন্টেইনার ক্যারিয়ার ট্রাক ক্রয়ের দরপত্রে (আইডি : ১১২০৫০৩) গুরুতর জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি কোনো আকস্মিক অভিযোগ নয়, বরং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উঠে আসা সত্য। চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান কমডোর এবিএম সামসুল আলম নগর ভবন থেকে প্রতিষ্ঠানটির কাছে একটি লিখিত ব্যাখ্যা তলব করেন। নোটিসে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ জুলাই আহ্বান করা সংশ্লিষ্ট দরপত্রে প্রতিষ্ঠানটি যে দলিলাদি দাখিল করেছে, সেখানে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে।
তদন্তে দেখা যায়, এইচটিএমএস লিমিটেড ইতালির ‘কস-ইকো ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ’কে প্রস্তুতকারক দেখিয়ে যে অথরাইজেশন লেটার ও ‘এফ-এইট’ মডেলের ক্যাটালগ জমা দিয়েছে, ইতালীয় ওই কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটে সেই মডেলের কোনো অস্তিত্বই নেই। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, দাখিল করা ক্যাটালগের ছবি ও কারিগরি বিবরণী ফিনল্যান্ডের সুপরিচিত প্রস্তুতকারক ‘হায়াব’-এর ‘মাল্টিলিফট ফিউচারা এইট’ মডেলের ক্যাটালগ থেকে হুবহু নকল করা হয়েছে। এ বিষয়ে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতালি ও ফিনল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করা হলেও কোনো পক্ষ থেকেই সাড়া পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয়টি ছিল মামলার তথ্য গোপন করা। নিয়ম অনুযায়ী দরদাতাকে বাধ্যতামূলকভাবে মামলার ইতিহাস বা লিটিগেশন হিস্ট্রি দাখিল করতে হয়। কিন্তু এইচটিএমএস লিমিটেড তা করেনি। অথচ বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) পোর্টালে দেখা যায়, ইতঃপূর্বে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জালিয়াতির দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। যদিও রিট পিটিশনের মাধ্যমে ওই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত ছিল, কিন্তু এ ধরনের সংবেদনশীল তথ্য গোপন করাকে ডিএনসিসি সরাসরি জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে।
এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী গত ২০ নভেম্বর এইচটিএমএস লিমিটেডকে আগামী বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ই-জিপি সিস্টেমে ডিবার ঘোষণা করা হয়। জালিয়াতির দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার মাত্র ছয় দিন পর নাটকীয় মোড় নেয় পুরো বিষয়টি। গত ২৬ নভেম্বর ডিএনসিসির যান্ত্রিক বিভাগ থেকে এইচটিএমএস লিমিটেডকে দুটি ভিন্ন দরপত্রে ৩৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর আওতায় ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকায় পাঁচটি কমপ্যাক্টর ট্রাক এবং ১৬ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায় পাঁচটি আর্ম রোল কন্টেইনার ক্যারিয়ার ট্রাক সরবরাহের দায়িত্ব পায় নিষিদ্ধ হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি।
এই দ্বিমুখী সিদ্ধান্তের বিষয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কমিটি কাজ দিয়েছে, লোয়েস্ট (সর্বনিম্ন) দরদাতা হওয়ায় তারা কাজ পেয়েছে। ডিবার হয়েছে পৃথক একটি টেন্ডারে, সেখানে তারা কাজ পায়নি। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। যে টেন্ডারে কাগজপত্র কোয়ালিফাই করেনি, সেখানে কমিটি ব্যবস্থা নিয়েছে। আর যে টেন্ডারে কোয়ালিফাই করেছে, সে বিষয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা। বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) এসএম মঈন উদ্দীন আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানকে ডিবার (বারিত) করার পর কাছাকাছি সময়ে সেই প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় কাজ দেওয়া যাবে না। এমনটি হলে তা মারাত্মক বিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। তবে আদালতের কোনো রুল বা স্থগিতাদেশ থাকলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।’
আইন অনুযায়ী, ডিবারমেন্ট কোনো নির্দিষ্ট দরপত্রভিত্তিক শাস্তি নয়, বরং নির্ধারিত সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেশের সব সরকারি ক্রয় কার্যক্রম থেকে অযোগ্য ঘোষণা করার একটি আইনগত ব্যবস্থা। নতুন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫-এর বিধি ১৯৬ অনুযায়ী, প্রতারণা বা জালিয়াতির কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ হলে ওই মেয়াদে সে বাংলাদেশের যেকোনো সরকারি সংস্থার ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এমনকি বিধি অনুযায়ী পূর্বে সম্পাদিত চুক্তি কার্যকর অবস্থায় থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।
ক্রয় বিশেষজ্ঞদের মতে, এক দরপত্রে প্রতারণা প্রমাণিত হওয়ার পর অন্য দরপত্রে কাজ দেওয়া শুধু বিধি লঙ্ঘন নয়, বরং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল। ডিবারমেন্ট ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত ও ভবিষ্যৎ অনিয়ম প্রতিরোধ করা। বর্তমানে জালিয়াতির দায়ে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও এইচটিএমএস লিমিটেডের হাতে বিশাল অঙ্কের কার্যাদেশ বহাল থাকা নিয়ে নগর ভবনে নানা গুঞ্জন ও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকারি ক্রয়ে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।