রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:০৩ এএম
আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
প্রার্থীদের রঙিন পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে রাজধানীর রাজপথ। প্রবা ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই প্রার্থীদের রঙিন পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে রাজধানীর রাজপথ থেকে অলিগলি। বিভিন্ন সড়কের মোড়, ফুটপাত, দেয়াল, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে শুরু করে ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের পিলার- রেহাই পাচ্ছে না কোনো কিছুই। এই পরিস্থিতিতে শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত কবিতার লাইন ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’র অনুকরণে বলতে হয়Ñ ঢাকায় এখন মুখ ঢেকে যায় পোস্টার-ব্যানারে।
নির্বাচন ঘিরে এ রকম নির্বিচার প্রচারণায় নষ্ট হচ্ছে শহরের সৌন্দর্য। তৈরি হচ্ছে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি। তা ছাড়া ভোটের প্রচারণায় এবার পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞাকে পাত্তাই দিচ্ছে না কোনো দল। এই প্রেক্ষাপটে অনুমতি ছাড়া দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো ঠেকাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ডিএসসিসি। স্বল্পমাত্রায় অভিযান চালাচ্ছে ডিএনসিসি। অন্যদিকে তফসিল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন না সরালে আচরণবিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
গতকাল রবিবার সরেজমিন দেখা গেছেÑ দোলাইপাড় মোড়, ডেমরা, তেজগাঁও, পলাশীবাজার, কুড়িল, পুরানা পল্টন, গুলিস্তান, নয়াপল্টন, মতিঝিল, ধানমন্ডি, নতুন বাজার, নর্দা, বাড্ডা, গুলশানসহ উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটি করপোরেশনের প্রায় সব এলাকাতেই চলছে ব্যাপক প্রচারণা। ডিজিটাল প্রিন্টের বিলবোর্ড, ফেস্টুনে ভরে গেছে চারপাশ। পুরান ঢাকার আজিমপুর, পলাশী, লালবাগ থানা ভবনের সামনে বেড়িবাঁধ, কামরাঙ্গীরচর, লোহারপুল ঢাল, সোয়ারীঘাট, চকবাজার, ইসলামবাগ, বংশাল, নয়াবাজার, তাঁতীবাজার, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, বাদামতলী, সদরঘাট, বেগমবাজার, হোসনী দালান, ফুলবাড়িয়া, নবাবপুর, কাপ্তানবাজার, ধোলাইখাল, রায়সাহেব বাজারÑ সব এলাকার দেয়াল ও মোড়েই ঝুলছে বিপুল প্রচারসামগ্রী। এমনকি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের গায়েও দেখা গেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠনের ব্যানার।
ঢাকা-৫ আসনের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় পোস্টার লাগাতে থাকা জামায়াত কর্মী আতাউল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হলে সাদাকালো পোস্টার লাগাতে হবে। এখনও ঘোষণা হয়নি, তাই রঙিন পোস্টার লাগানো যাচ্ছে। তবে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন নিতে হয়Ñ তা তো জানি না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগাম প্রচারণার ঢেউ মূলত প্রার্থীদের প্রস্তুতির অংশ। ভোটারদের কাছে নিজের পরিচিতি বাড়িয়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিগত তিনটি নির্বাচনে দেশের মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। প্রার্থীরা চাইছেন ভোটের আগেই ভোটারদের মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলতে। তবে প্রচারণা যেন সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকে।’
এদিকে আগাম প্রচারণা নিয়ে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গত ২ ডিসেম্বর জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে ডিএসসিসি জানায়Ñ অনুমতি ছাড়া ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ও নির্বাচনী প্রচারপত্র স্থাপন করা হচ্ছে, যা ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’-এর পরিপন্থী। পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার লক্ষ্যে এসব স্বউদ্যোগে অপসারণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়Ñ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সরাচ্ছি, তারা আবার লাগাচ্ছেÑ এ যেন অনেকটা চোর-পুলিশ খেলা।’
নাগরিক অধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেনÑ তফসিলের আগেই প্রচারণার এই উন্মাদনা নীতিমালা লঙ্ঘন বাড়াচ্ছে এবং অরাজকতার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের মতে, তফসিলের আগে প্রচারণা সীমিত থাকা উচিত ছিল; কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টোÑ রাজধানী এখনই নির্বাচনী প্রচার সামগ্রীতে ঢেকে গেছে বলা যায়। এ বিষয়ে সেন্টার ফর সিটিজেনস রাইটস’র (সিসিআর) মুখপাত্র ইকবাল কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই প্রবণতা ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নয়, তবে এবারের মাত্রা আগের সব সময়কে ছাপিয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন পোস্টার লাগছে; পুরনোর ওপরও নতুন ছবি সাঁটা হচ্ছে। প্রচারণার এই দাপটে শহর যেন অপরিচ্ছন্ন হয়ে উঠছে। এতে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানো দরকার। দলগুলোকেও এসব বিষয় ভাবতে হবে। তা না হলে ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, গত নভেম্বরজুড়ে ১০টি অঞ্চলের ৫২টি ওয়ার্ডে মোট ২ লাখ ৪৭ হাজার অবৈধ ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টার অপসারণ করা হয়েছেÑ যার ২৮ শতাংশ রাজনৈতিক, ২১ শতাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ১৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেই এত প্রচারসামগ্রী অপসারণ করতে হয়েছে। অলিগলিতে আরও বেশি আছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রচারণা সামগ্রী লাগাতে অনুমতি নিতে হয়Ñ অনেকেই হয়তো জানেন না। নগরের দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে বিষয়টি অবহিত করব। সামনে নির্বাচনÑ তাই নির্বাচন কমিশন থেকেও যথাযথ নির্দেশনা আসবে বলে আশা করি।’
এদিকে তফসিল ঘোষণা না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন বর্তমানে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবে গতকাল রবিবার কমিশন সভার পর নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, ‘তফসিল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন নামানো না হলে আচরণবিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অবৈধ ব্যানার-ফেস্টুন-লিফলেট অপসারণে অভিযানে নামছে ডিএসসিসি। আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি (সিটি কলেজ) মোড়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ডিজিটাল ব্যানার-ফেস্টুন একধরনের প্লাস্টিক। এগুলো পরিবেশের ওপর বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলে। এগুলো ড্রেন ও নদী-নালায় পড়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক সময় এসব প্লাস্টিক ড্রেনে গিয়ে পানি ঠিকমতো পাস হতে পারে না, ড্রেন উপচে পড়ে। সব মিলিয়ে ঘটে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ।’