মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৩ পিএম
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর গণপরিবহনগুলো নিম্ন সেবা ও উচ্চ ভাড়া আদায় করছে, এসব অভিযোগ পুরনো। ঢাকার ১২২টি রুটে যে বাসগুলো চলাচল করে, সেগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই যাত্রীসেবার ব্যাপারে চরম উদাসীন। রুগ্ণ ও ভাঙাচোরা বাসগুলো অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এই জোড়াতালির গণপরিবহনই যেন রাজধানীবাসীর নিয়তি!
চলতি বছরের ২৬ আগস্ট রাতে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, শারীরিকভাবে সক্ষম, নারী, শিশু এবং বয়স্কদের জন্য বাসে ওঠা অনেক কঠিন হয়। বলা হয়, ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ অকার্যকর রুটে চলা বাস। এ কারণে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে এবং প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই বিবৃতি থেকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার দুর্দশার চিত্র স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, ভিক্টোর পরিবহনের অধিকাংশ বাসের অবস্থা নাজুক। পুরনো বাসগুলো রঙ করে চালানো হয়। বসার সিট, পাখা, দরজা-জানালা জরাজীর্ণ। এসব বিষয় অস্বীকার করেন এই কর্মকর্তা। আকাশ, অভিজাত, মনজিল, ভিআইপি, আজমেরীÑ এসব বাসের প্রায় একই অবস্থা।
ভিক্টর পরিবহনের বাসে অফিস টাইমে উপচে পড়া ভিড় থাকে। সিটের বাইরে কোনো নারীকে বাসে ওঠানো হয় না। এই রাস্তায় নারীরা সিগন্যাল দিলেও ৫টি মহিলা সিটের বাইরে চালক-কনডাক্টর নারী যাত্রী ওঠাতে নারাজ। এটা প্রায় প্রতিদিনের চিত্র।
মেরুলের পারভীন তার ৬ বছরের বাচ্চা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, অনেক কসরত করে শাহবাগগামী তরঙ্গ বাসে ওঠেন। বসার সিট পাননি, গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থেকেই শাহবাগ গিয়ে নামেন। শামীম (ছদ্মনাম) প্রায় প্রতিদিন মগবাজার চৌরাস্তা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা যাতায়াত করেন। সকালে যাত্রীদের চাপে বাসে উঠতে পারেন না, একাধিক বাস ছেড়ে গিয়ে উঠতে পারলেও কোনো আসন ফাঁকা পান না।
সবার জন্য ঢাকার গণপরিবহন এক অস্বস্তির নাম। বাসের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়, আসন ফাঁকা থাকে না, ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত ও সংর্কীণ আসন, উপচে পড়া ভিড়। এছাড়া নারীদের চলাচলের জন্য আতঙ্কের নাম ঢাকার বাসগুলো। প্রায় ৯৮ শতাংশ বাসে নারীদের জন্য ৫টা আসন বরাদ্দ রাখা হয় ইঞ্জিনের বামপাশে, যা নিতান্তই অপ্রতুল।
রাজধানীর বাসসেবার বিষয়ে কথা হয় ভিক্টর পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম ফারুখ মানিকের সাথে। তার কোম্পানির অধীনে প্রায় ২০০ বাস রাজধানীতে চলাচল করে। তবে রুট পারমিট আছে ১৩৫টির, বাকিগুলো বিআরটিসি থেকে অনুমোদন নিয়ে চালানো হয় বলে তিনি জানান। ভিক্টরের এই কর্মকর্তা জানান, আমরা ব্যবসার সুফল পাচ্ছি না, চালকদের কাছে জিম্মি। তবে রাজধানীতে সরকারি উদ্যোগে অবকাঠামোগত সহযোগিতা করা হলে এবং সুনির্দিষ্ট কাউন্টার ও স্টপেজ চালু করা গেলে মালিকরা চালকদের সাথে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে, তখন যাত্রীসেবার মান উন্নত হবে।
বিআরটিএর একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে রাজধানীর ২৯১টি রুটে চলাচল করা বাসের সংখ্যা ৯ হাজার ২৭। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে টঙ্গীর আব্দুল্লাহপুর রুটে চলছে তুরাগ পরিবহনের বাস। টঙ্গী এলাকায় এই পরিবহনের দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাবু এই প্রতিবেদককে বলেন, তাদের রুট পারমিট আছে ১৩৭টি বাসের, চলছে ৫৫টি। জানা যায়, এসব বাসের অধিকাংশেরই ফিটনেস মেয়াদোত্তীর্ণ। তুরাগ পরিবহন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতার হোসেন শামীম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চলতি বছরে তাদের বাসের সংখ্যা কমে ৬০টিতে দাঁড়িয়েছে। সরকার ২০১৮ সালের পর থেকে রুট পারমিট দেওয়া বন্ধ রেখেছে। এমনকি সরকার ‘রিপ্লেসমেন্ট রুট’ পারমিটও দিচ্ছে না, ফলে আমরা পুরনো গাড়ি স্থানান্তর করে নতুন গাড়ি নামাতে পারছি না।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে ২০ বছর ইকোনমিক লাইফ (অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল) নির্ধারণ করেছে সরকার। চলতি বছরের জুলাই থেকে এ আদেশ কার্যকর হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৬-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে ২০ বছর ইকোনমিক লাইফ নির্ধারণ করল। ২০২৪ সালের জুন মাসের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচলকারী ৭৫ হাজারের বেশি বাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ট্যাংকলরির আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো এসব যানবাহন দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে এবং পরিবেশদূষণ করছে। সড়ক থেকে পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরিয়ে নিতে ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়েছিল সরকার। সেই সময়সীমা মে মাসে শেষ হয়েছে। কাগজে-কলমে ডাম্পিংয়ের কথা বলা হলেও পুরনো বাস রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
ভূইয়া পরিবহনের বাসে আব্দুল্লাহপুর থেকে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা। আগারগাঁও থেকে কুর্মিটোলা পথে যাত্রীর কাছ থেকে কনডাক্টর ৪০ টাকা দাবি করেন। এটা নিয়ে যাত্রীদের সাথে বাদানুবাদ লেগেই থাকে। এ নিয়ে কনডাক্টর জানান, গাড়ির কর্তৃপক্ষ ওয়েবিল এভাবেই ভাড়া নির্ধারণ করে রেখেছে।
ইকোনমিক লাইফ শেষ হবার পরও কেন বাসগুলো রাস্তায় চলাচল করে এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে রেজিস্ট্রিকৃত গাড়ির চেয়ে বেশি বাস চলছে। ২০২৪ সালে ৩০০০ গাড়ি ও চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২০০ গাড়ি ডাম্পিং করা হয়েছে। স্ক্র্যাব পলিসির জন্য মিটিং চলছে, আলোচনা চলছে, তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। তবে বাস ডাম্পিংয়ের পর মালিকদের কতটা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে সে বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক বাসের জন্য রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট এবং রুট পারমিট থাকা বাধ্যতামূলক। এসব কাগজ নবায়নের জন্য প্রতি বছর বাস-মালিকদের ছুটতে হয় বিআরটিএর সার্কেল অফিসে। বাস-মালিকদের অভিযোগ নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও ঘুষ ছাড়া ফিটনেস সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না। আর এই ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যার মেগাসিটিতে ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তার একটি অংশ দখল করে নিচ্ছে। এর কারণ অফিস ও স্কুল সময়ে রাজধানীর বাসগুলোতে প্রায়ই আসন ফাঁকা থাকে না। নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য বাসে যাতায়াত করা চ্যালেঞ্জিং। একটি রুটে ধারণক্ষমতার চেয়ে কম বাস সার্ভিস থাকায় ভিড় সামলে অনেকেই বাসে যেতে চায় না। এসব কারণে ব্যক্তিগতভাবে গাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছে।
ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিষয়ে কথা বলতে গেল বিআরটিএ পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) নাজনীন হোসেন কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
তবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি এখানে অল্প কিছুদিন যোগদান করেছেন। ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে ডাম্পিংয়ের পর বিকল্প বাস ওই রুটে নামানো হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের তিনি কোনো উত্তর দেননি। বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, গণপরিবহন বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাতে কথা বলেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ইকোনমিক লাইফ শেষ হওয়া বাসগুলো ডাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে মালিককে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। বাড়তি বাসভাড়া আদায় করা হয় এমন অভিযোগের উত্তরে বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান।