গবেষণার তথ্য
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ২০:০৬ পিএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ২০:১৫ পিএম
গ্রিন হাউস গ্যা্সের প্রভাব; প্রতিবেদনে বিএমডি
উন্নত বিশ্বের গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। সেই ধাক্কা এসে লাগছে বাংলাদেশেও। এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সৃষ্টি হচ্ছে অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টিন মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তা ছাড়া অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমনÑ বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙনও বাড়ছে। উত্তর মেরুর বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এসব দুর্যোগে আক্রান্ত দেশের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যে আরেকটি উদ্বেগের তথ্য উপস্থাপন করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) ও নরওয়েজিয়ান মেটিরিওরোলজিকাল ইনস্টিটিটিউটের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’-২০২৫ শীর্ষক নতুন গবেষণায়। তাতে বলা হয়েছে- যেভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটি কমানো না গেলে একুশ শতকে বাংলাদেশের তাপমাত্রা সাড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ২০৫০ সালের মধ্যেই ৯ লাখ জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুৎ হতে পারে।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর হোটেল শেরাটনে রিপোর্টটির প্রকাশ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি বিএমডি এবং নরওয়েজিয়ান মেটেরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে প্রণয়ন করেছে। কারিগরি সহায়তা দিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এইচ ই হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন, বিশেষ অতিথি ছিলেন সেভ দ্যা চিলড্রেন অব জার্মাানির পোর্টফলিও ম্যানেজার আনিকা লফ, সেভ দ্যা চিলড্রেন অব বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর রহমত উল্লাহ, গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বিএমডির আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ ও নরওয়ের পক্ষ থেকে গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন হেন্স অলাভ হায়েন, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপপরিচালক এস.এম.কামরুল হাসান। আবহাওয়াবিদ মো. মনোয়ার হোসেন ও রাজিয়া সুলতানার উপস্থাপনায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনিক বিভাগের উপ পরিচালক মোঃ নূরুল করিম, ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ মোঃ রুবাঈয়্যাৎ কবীর, ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক প্রমুখ।

ড. মো. বজলুর রশিদ তার গবেষণায় জানান, বর্তমানে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে তাতে যদি এর মূল কারণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো না যায় তাহলে ২০৪১-২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা এক থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। এছাড়া ২১০০ সালের মধ্যে সেই তাপমাত্রা দেড় থেকে সাড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গবেষক জানান, দেশে বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন হতে পারে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং শতাব্দীর শেষে মোট বৃষ্টিপাত গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি বৃদ্ধির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এসব অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধ্বসও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবী গরম হওয়ায় সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে ও বরফ গলে জল বাড়ে। এর ফলে বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় বন্যা বাড়বে। এর ফলে ২০৫০ সালের মধ্যেই প্রায় ৯ লাখ মানুষ স্থায়ী বন্যার কারণে বাস্তুচ্যুৎ হতে পারে। পাশাপাশি তাপপ্রবাহ আরও বেড়ে যাবে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় সারা বছরই তীব্র গরম থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই আবহাওয়াবিদ।
জলবায়ুর এই পরিবর্তন মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকার উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে উল্লেখ করে ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, বেশি গরমে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়বে আর তীব্র গরমে শ্রমিকদের কাজ করা কঠিন হবে। তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। সমুদ্রের পানি বাড়লে লবণাক্ততা বাড়বে। এতে করে ফসল, মাছ ধরা ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও গবেষণায় দাবি করা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হয়। তাতে গবেষক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একদিনে থামানো যাবে না, এমনকি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালেও কিছু পরিবর্তন হবে। কিন্তু গ্যাস ও দূষণ কমানো না গেলে ভবিষ্যতের ক্ষতি ভয়াবহ হবে। তাই দুইভাবে কাজ করতে হবে। এগুলো হলোÑ দূষণ কমানো এবং ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি হিসেবে বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি ও পূর্বাভাস পেতে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার।
তা ছাড়া গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র ও বিস্তৃত তাপপ্রবাহ মৌসুমে ১৫–২৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূমির সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চরম গরমের মাত্রা ১ শতাংশ বাড়লে শিশু খর্বকায়তার ঝুঁকি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
এইচ ই হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন বলেন, এ গবেষণা রিপোর্টে বাংলাদেশের জলবায়ু প্রক্ষেপণ খুবই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ৪.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাতে করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উপকূলীয় মানুষকে হুমকিতে ফেলবে। আর তীব্র হিটওয়েভ স্বাস্থ্য, কৃষি ও নিরাপদ পানির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। এগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
তিনি বলেন, নরওয়ে সরকারের জন্য বাংলাদেশ, বিএমডি এবং জাতীয় অংশীদারদের জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে সহযোগিতা করা তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশ একটি দৃঢ় ও সহনশীল দেশ। আর এই প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পদক্ষেপে ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি অপরিহার্য। সামনে নির্বাচন, এবং আমি আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো এসব প্রক্ষেপণ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেবে।
মোঃ মমিনুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি দ্রুততর হচ্ছে এবং আমাদের গ্রহের উষ্ণায়ন এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ উষ্ণ বছরগুলোর একটি। অক্টোবর ২০২৫ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ইতিহাসের সর্বাধিক উষ্ণ অক্টোবরগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে মধ্য-শতাব্দীতে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানের (এনএপি) মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, টেকসই নগরায়ণ এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানসহ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
তা ছাড়া অনুষ্ঠানে সেভ দ্য চিলড্রেনের বক্তরা জানায়, ভবিষ্যৎ জলবায়ু প্রক্ষেপণকে অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন, কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু সহনশীলতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে।