দক্ষিণ সিটির ৫১ নম্বর ওয়ার্ড
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:১৭ পিএম
আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:২০ পিএম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে ঘুন্টিঘর থেকে মীর হাজিরবাগ পর্যন্ত বেহাল সড়কে জমে আছে ময়লা পানি ও আবর্জনা। প্রবা ফটো।
নোংরা-পচা পানি, ভাঙা রাস্তা আর মাদকের আঁতুড় ঘর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫১ নম্বর ওয়ার্ড। মীর হাজারীবাগ, দোলাইপাড় ও পাড় গেণ্ডারিয়া নিয়ে গঠিত এ ওয়ার্ডটি ডিএসসিসির অঞ্চল-৫-এর অধীনে। ওয়ার্ডজুড়ে সিটি করপোরেশনের কোনো নিজস্ব স্থাপনা নেই, নেই কমিউনিটি সেন্টার বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)।
সরেজমিন ওয়ার্ডটি ঘুরে দেখা গেছেÑ প্রায় প্রতিটি সড়ক ভাঙাচোরা, সড়ক বাতি নেই অধিকাংশ স্থানে, যত্রতত্র সুয়ারেজের পচা পানি ও ময়লা জমে আছে। স্থানে স্থানে পথচারী ও যানবাহনের বিপদ বাড়িয়ে তুলেছে ঢাকনা খোলা ম্যানহোল। সামান্য বৃষ্টিতেও তলিয়ে যায় পুরো ওয়ার্ড। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ঘুন্টিঘর মোড় থেকে মীর হাজারীবাগের ৪৭১/বি হোল্ডিংয়ের সামনের সড়কটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত। গর্তে জমে থাকা নোংরা পানিতে মিশে গেছে ড্রেনের পয়ঃবর্জ্য। চৌরাস্তা থেকে পাইপ রোড পর্যন্ত সড়কটিরও বেহাল দশা। বেশকিছু ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। মাদ্রাসা রোড ও বাগিচা মসজিদসংলগ্ন সড়কের ম্যানহোলের ঢাকনাগুলোও উধাও।
ওয়ার্ডের পূর্ব দোলাইপাড় এলাকায় ১ থেকে ৩ নম্বর গলি পর্যন্ত বেশকিছু পুরনো নিচু বাড়ির নিচতলা এখন কার্যত অচল। বৃষ্টি হলেই পানি ঢোকে এসব ঘরে। তিন নম্বর গলিতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কে জমে আছে সুয়ারেজের পচা পানি। ফাঁকফোকরে বিছানো কয়েকটি ইটের ওপর দিয়েই স্থানীয়রা চলাচল করেন। ১ নম্বর গলির শুরুতেই সুয়ারেজের পানি উপচে সড়কে উঠছে। ২ নম্বর গলিতে সড়কের নিচের ড্রেনের স্ল্যাব ভাঙাÑ রিকশাচালকদের চলতে হয় আতঙ্ক নিয়ে। তিন নম্বর গলির ২৮৬/১ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাসিন্দা মো. জজ মিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি ওঠে। একবার উঠলে নামতে অনেক সময় লাগে। এ ছাড়া সড়কে পচা পানি জমে থাকে, হাঁটতেও কষ্ট হয়। মশার উপদ্রবও মারাত্মক। মাঝে মাঝে ওষুধ ছিটায় কিন্তু নিয়মিত না। ঝাড়ুদারও আসে না, অথচ হোল্ডিং ট্যাক্স ঠিকই নেয়।’
২ নম্বর গলির ভাড়াটিয়া গিয়াস উদ্দিন, যিনি ৩৫ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করছেন। বর্তমানে ২৩৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের এই বাসিন্দা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই সড়ক ও নিচু বাসাগুলো ডুবে যায়। পানির কারণে রাস্তার গর্তগুলো দেখা যায় না। ফলে লোকজন পড়ে আহত হয়, রিকশা উল্টে যায়।’ এদিকে পশ্চিম দোলাইপাড়ের ভাড়াটিয়া আব্দুল করিম বলেন, ‘আমাদের বাড়িটা রাস্তার চেয়ে নিচু। বৃষ্টিতে নিচতলা তলিয়ে যায়। আসবাবপত্র নষ্ট হয়। মেশিন দিয়ে পানি টেনে বের করতে হয়।’
খোলা ম্যানহোলে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে অটোরিকশা, সিএনজি ও পথচারীরা। বৃষ্টি হলেই চৌরাস্তা সিট মার্কেটের এমএস টিটো আইরনের সামনের সড়ক এবং মীর হাজারীবাগ মাদ্রাসা রোড পানিতে ডুবে যায়, চেনা যায় না কোথায় লুকিয়ে আছে ফাঁদ। এই নোংরা পরিবেশ থেকে মুক্তির আশায় ব্যক্তি উদ্যোগে বেশকিছু ড্রেন পরিষ্কার করেছেন ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কাজী আতাউর রহমান লিটু। স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত লিটু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ওয়ার্ডের প্রতিটি সড়কই নষ্ট। রিকশা থেকে শুরু করে সব যানবাহন চলতে কষ্ট হয়। ড্রেন ও সুয়ারেজগুলো ময়লায় ভরা, বৃষ্টিতে পানি নামে না, বাসা-বাড়ি ডুবে যায়। রাস্তায় লাইটও নেই। মানুষ সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসে। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকটি ড্রেন পরিষ্কার করেছি। রাবিশ কিনে এনে সড়কে ফেলে চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা করেছি। ওয়ার্ডের সমস্যাগুলো সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছি।’
নাগরিক সমস্যা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো তদারকি নেই বলে দাবি করেছেন ওয়ার্ডের পশ্চিম দোলাইপাড়ের বাসিন্দা মৌসুমী হুসাইন। এই গৃহিণী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত বছরের ৫ আগস্টের পর থমকে গেছে নগর সেবা। কেউ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে না। আমরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বয়ে চলেছি।’
এদিকে ওয়ার্ডের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকৌশলী (পুর) ও স্থানীয় গণ্যমান্যদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করে ৫১ নম্বর ওয়ার্ড সচিব শফিকুল ইসলাম শফিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সড়ক বাতি ও ম্যানহোলের ঢাকনার বিষয়টি নিয়মিতভাবে জোন অফিসে জানানো হয়। ময়লার বিষয়েও সপ্তাহে দুদিন আমি নিজে তদারকি করি। ঘুন্টিঘর মোড় থেকে মীর হাজারীবাগ পর্যন্ত সড়ক সংস্কারের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।’
তবে নাগরিক দুর্ভোগের পাশাপাশি এই ওয়ার্ডে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারও চোখে পড়ার মতো। অভিযোগ রয়েছে পাড় গেণ্ডারিয়া ও মীর হাজারীবাগের মোল্লাপাড়ায় সক্রিয় রয়েছে মাদকসম্রাজ্ঞী রহিমার সিন্ডিকেট। আরও অভিযোগ রয়েছে রহিমার হয়ে কাজ করছে শুক্কুর, বড় বেলবাটি ওরফে আরিফ, গেসু, ছোট বেলবাটি ওরফে রনি এবং শফিকের ছেলে ল্যাংড়া মিলন। এ ছাড়া অনিক, রাকিব ও শাকিবের চক্রও নিয়মিত মাদক ব্যবসা চালায়। একইভাবে আমেনা, শুভ, নান্টু চান্দি রতন ও কবুতর হৃদয়ের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে মীর হাজারীবাগ ওয়াসা রোড ও পূর্ব পাড়ায়।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। পার গেণ্ডারিয়া ও মীর হাজারীবাগ এলাকাতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।’ কারাবন্দি রহিমা বেগমের সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় আছেÑ এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি থানাকে জানানো হবে।’ তবে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।