দক্ষিণ সিটির ২২ নম্বর ওয়ার্ড
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:১০ এএম
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:১১ পিএম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ড জর্জরিত মাদক, কিশোর গ্যাং, জলাবদ্ধতা ও পানির সংকটে। ওয়ার্ডের গণকটুলি সিটি কলোনি এখন মাদক ব্যবসার ঘাঁটি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনের বেলাতেই এখানে খোলামেলা বিক্রি হয় ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা। এলাকাটি পরিণত হয়েছে বখাটে ও মাদকসেবীদের আখড়ায়। সকাল-বিকাল কলোনির অলিগলিতে দেখা মেলে মাদকের। কেউ খুচরা বিক্রি করে, কেউ পাইকারি সরবরাহ দেয়। নেই নিরাপত্তা, নেই দেখাশোনার কোনো ব্যবস্থা।
অঞ্চল-৩ এবং হাজারীবাগ থানার আওতাধীন পুরান ঢাকার এই ওয়ার্ডটি। এছাড়া ২২ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে মনেশ্বর রোড, মনেশ্বর লেন, বাড্ডানগর লেন, বোরহানপুর লেন, কুলাল মহল লেন, কাজীরবাগ লেন, নবীপুর লেন, হাজারীবাগ লেন, হাজারীবাগ রোড, কালুনগর, এনায়েতগঞ্জ, ভাঙ্গী কলোনি, নীলাম্বর সাহা রোড ও ভাগলপুর লেন।
হরিজন সম্প্রদায়ের বসবাস গণকটুলির সিটি কলোনিতে। পেশায় তাদের অধিকাংশই পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তবে দীর্ঘদিন ধরেই মাদককাণ্ডের জন্য আলোচিত এই কলোনি। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কলোনির উত্তরমুখী প্রবেশপথে রয়েছে বেশ কয়েকটি মুদি দোকান। মুদিপণ্যের পাশাপাশি সেখানে বিক্রি হয় ইয়াবা ও গাঁজা। দোকানগুলোর টেবিলে বসে কিছু মানুষ আড্ডা দেয়; তারাই ঘুরে-ফিরে মাদকের বিভিন্ন ওজনের পুরিয়া সেবনকারীদের সরবরাহ ও টাকা সংগ্রহ করে। এই কারবারিদের অনেককেই দেখা যায়, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টের ওপর লুঙ্গি পরে আছেন। তারা প্যান্টের পকেটে মাদক রাখছেন। আবার এদেরই কেউ কেউ অলিগলিতে ঘুরে পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করছেন। হরিজন কলোনি হলেও এখানকার ইয়াবা ও গাঁজার কারবারের মূল হোতারা বাইরে থেকে আসা মানুষ।
এই কলোনির মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় কিশোর গ্যাংও। অভিযোগ রয়েছে, উঠতি বয়সের ছেলেরা এ ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে, তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে বহিরাগতরাও। বছরের পর বছর ধরে এখানে সক্রিয় কথিত ‘মাদক সম্রাট’ ও ‘সম্রাজ্ঞী’রা প্রশাসনের চোখের সামনেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও কখনও কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও কদিন পরই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়।
অভিযোগ রয়েছে, গণকটুলির সিটি কলোনিতে মাদকের কলকাঠি নাড়েন স্বপন ওরফে বরিশাইলা স্বপন, তার স্ত্রী মাসু, টিটু, আমির ওরফে সোর্স আমির ওরফে দাড়িওয়ালা আমির, মানিক ওরফে কালা মানিক, তার স্ত্রী সম্মেহের, সাঈদ ওরফে বরিশাইলা সাঈদ, আকাশ, আলামীন ওরফে চোর সরদার আলামীন, সাবানা, সাবা, শিল্পী, শেলী, শুখি, রিপন ওরফে মাদারী রিপন, জুল্লা, সামেদ, জাফর হোসেন রানা, লিটন, কালন, আফসানা, সুমা, পারভিন, মজিবুর, সোহেল, ইয়াসিন, ইয়ামিন, হজরত আলী ও আক্তার ওরফে শুখির জামাই আক্তার। এদের কেউ ইয়াবা বিক্রি করেন, কেউ গাঁজা, আবার কেউ রয়েছেন কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে।
তবে সিটি কলোনিসহ পুরো এলাকাতেই মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছে জানিয়ে হাজারীবাগ থানার ওসি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। এতে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে মাদক বিক্রেতাদের দণ্ড দেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে মাদকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্থানীয়দের নাগরিক দুর্ভোগও। এই ওয়ার্ডের মনেশ্বর, কালুনগর ও আশপাশের এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে। নবীপুর লেন, হাজারীবাগ রোড, বাড্ডানগর লেন ও ভাগলপুর এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে কল খুললেও পানি আসছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে বোতলজাত পানি কিনে পান করতে। আবার হাজারীবাগের বাসিন্দাদের গোসলের পানি আনার জন্য যেতে হচ্ছে বোরহানপুরের ১০ নম্বর গলিতে। সেখান থেকে লাইন ধরে গোসল ও কাপড় ধোয়ার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
৬৫ নম্বর হাজারীবাগ রোডের বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন সানু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০ দিন ধরে পানি পাচ্ছি না। আবার পানিতে ময়লাও আসে। ওয়াসার বিলও দিচ্ছি, আবার পানি কিনেও খেতে হচ্ছে। খাবারের পানি কিনলেও গোসল ও কাপড় ধোয়ার পানি নেই। ওয়াসায় ফোন দিলে বলে যোগাযোগ করব, কিন্তু আমাদের দেখার কেউ নেই।’
এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-২ এর উপসহকারী প্রকৌশলী ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাজারীবাগ এলাকার পানির সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা পাম্প মেরামতের কাজ করছি। নতুন পাম্প বসানো হচ্ছে। এ কারণে উঁচু স্থানগুলোতে পানির চাপ কম। তবে দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে।’
অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ও নোংরার কারণে প্রকট হয়ে উঠছে দুর্ভোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ কালুনগর খাল ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। একসময় খালটি ছিল নিউমার্কেট, নবাবগঞ্জ ও হাজারীবাগ এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ। কিন্তু শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর কালুনগর খালের বড় অংশ মাটি ও আবর্জনা দিয়ে ভরাট করা হয়। ফলে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় পানি নিষ্কাশনের পথ। যে কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তায় জমছে হাঁটুপানি।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বোরহানপুর নতুন রাস্তায় পশ্চিম পাশের নির্মাণাধীন ভবনের সামনে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, মাঝে মাঝে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ময়লার স্তূপ সরায়। তবে তা নিয়মিত পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা। একই অবস্থা কোম্পানি ঘাটের নতুন রাস্তাতেও। এনায়েতগঞ্জ ও গণকটুলিতে ড্রেনেজের স্ল্যাব বসানো হয়নি। ফলে সেই ড্রেনে ময়লা ও পলিথিন পড়ছে। কালুনগর খালেও ময়লা জমছে। সেখানে জন্ম নিচ্ছে মশা। কালুনগর সিএনজি স্ট্যান্ডে চায়ের দোকানি মামুন বলেন, ‘সন্ধ্যার পর বসা যায় না। মশার কামড়ে টিকতে পারি না। ধোঁয়া দেয়, কিন্তু শুধু কেরোসিনের গন্ধ আসে- মশা মরে না।’
ভাগলপুর লেনের ৮৫/১ হোল্ডিংয়ের বাসিন্দা জিএম রোস্তম খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২২ নম্বর ওয়ার্ডের সমস্যার শেষ নেই। মাদক, জলাবদ্ধতা, পানির সংকট আর বিভিন্ন সড়কে নেই বাতি। এসব বিষয়ে ওয়ার্ড সচিবকে জানিয়েও কোনো কাজ হয় না। নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় কেউই আমাদের সমস্যাগুলো দেখছে না।’
২২ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মো. সাদ্দাম হোসেন বর্তমানে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন এবং বসেন সেখানেই। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নাগরিকরা কোনো সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করি। আমরা যা পারি করি, বাকিটা উচ্চপর্যায়ে জানাই।’