× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উত্তর সিটির ২৪ নং ওয়ার্ড

অবাধ দখলে হাঁটার পথ নেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৩ এএম

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৯:৫৭ পিএম

অবাধ দখলে হাঁটার পথ নেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে

ফুটপাত থেকে সড়ক- সব জায়গায়ই এখন দখল। কোথাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে রিকশা, কোথাও আবার কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকের দীর্ঘ লাইন। যেন পুরো এলাকা এক বিশাল গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। এমন চিত্রই দেখা যায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে, যার বড় অংশজুড়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল। এটি ঢাকা-১২ আসনের অন্তর্ভুক্ত।

শিল্পাঞ্চল হলেও এই এলাকায় গড়ে উঠেছে সরকারি দপ্তর, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমের কার্যালয়, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার। প্রতিদিন হাজারো কর্মস্থলমুখী মানুষ এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করে। অথচ এই ব্যস্ত সড়কগুলো এখন কার্যত বেদখলে গেছে। যেখানে একসময় মানুষ অবলীলায় হাঁটতে পারত, সেখানে এখন সারি সারি ট্রাক-ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ওয়ার্ডজুড়ে বিএনপির ২২টি ইউনিট সক্রিয়, তাদের কার্যালয়ও সড়কে গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হয়। 

বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা বলেন, ‘পুরো এলাকা এখন দখলে চলে গেছে। কোথাও ট্রাক, কোথাও রিকশার গ্যারেজ। রাস্তা থেকে ফুটপাত- কোথাও হাঁটার জায়গা নেই। কেউ ব্যবস্থা নেয় না।’

কুনিপাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহমানের অভিযোগ, সরকার পাল্টালেও দখলদারত্বে পরিবর্তন আসেনি। এক দল গেছে, আরেক দল এসে দখল বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে। ট্রাক আর রিকশার গ্যারেজের নিচে চাপা পড়ছে রাস্তা ও ফুটপাত। 

বুধবার গেলে দেখা যায়, সাতরাস্তার পশ্চিম পাশে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ট্রাক ও মিনি কাভার্ড ভ্যান। প্রায় পুরো রাস্তাই বন্ধ। পাশে চলছে ধীরগতির সংস্কারকাজ। উন্মুক্ত ড্রেনের ঢাকনা নেই। সড়কে লাল সরকি ফেলা। 

আরও কিছুদূরে কেপিআইভুক্ত কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার (সিএসডি)। প্রধান ফটকের সামনের সড়কজুড়ে ট্রাকের সারি। কোনোমতে খাদ্য সংরক্ষণাগারের প্রধান ফটকের সামনে মোটরসাইকেল ঢুকতে পারলেও তার পর আর যাওয়া যায় না। 

সিএসডির এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিদিন গাড়ি ঢোকা-বেরোনো বাধাগ্রস্ত হয়। কাজের সময় নষ্ট হয়। লিখিতভাবে সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছি। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

ডিএনসিসির অঞ্চল-৩-এর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) নুরুল আলম বলেন, ‘সড়ক দখলের চ্যালেঞ্জের মুখে কাজ করতে হয়। সারি সারি ট্রাক থাকে, হাঁটার জায়গা থাকে না। তবু অগ্রগতি ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’

সাতরাস্তা মোড় থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কজুড়ে মিনি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের দখল। এখানেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস লিমিটেড। এর ফটকের সামনেও একই দৃশ্য- সারি সারি ট্রাক। বিআরসি গলিতে দেখা গেল সড়কের ওপরই ট্রাক-ভ্যান মেরামতের অস্থায়ী কারখানা। চ্যানেল ২৪-এর গলির মুখে প্রতিদিন ১২ থেকে ২৩ ফুট লম্বা ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সড়কের অর্ধেক অচল। স্থানীয়রা একে বলেন ‘ভোলা স্ট্যান্ড’; যা ২০১৫ সালে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক উচ্ছেদ করেছিলেন। তখন ফুটপাত সংস্কার ও রাস্তা প্রশস্ত করা হয়। কিন্তু অল্প দিনেই এলাকা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পেছনে তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির সামনে এমনকি নিরাপত্তা মুদ্রণালয়ের উত্তর-দক্ষিণের গলিতেও এখন কাভার্ড ভ্যানের সারি। সাতরাস্তার কয়েক কদম দূরে রাষ্ট্রীয় ছাপাখানা বিজি প্রেস ‘ক’ শ্রেণির কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এর উত্তর পাশের সড়কেও নিয়মিত পার্ক করা হয় ভ্যান। বিজি প্রেস স্কুলের পেছনের উন্মুক্ত স্থানে প্রতিদিন ফেলা হয় বর্জ্য। ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেডের উত্তরের সড়কটি এখন রিকশার গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ১৪ নম্বর সড়কে ফ্লাইওভারের নিচে আছে বস্তি, ভাঙ্গারি দোকান, পোড়া মবিলের ব্যবসা আর রিকশা-ভ্যানের সারি। তিব্বতসংলগ্ন টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের পাশের ফুটপাতেও টিনের ছাউনি দিয়ে উঠেছে নতুন গ্যারেজ।

সাতরাস্তা থেকে আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় সব সড়কেই একই চিত্র। কলোনি বাজারের তেজগাঁও সরকারি হকার্স মার্কেটের সামনেও বিশাল রিকশা গ্যারেজ। তবে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রশাসন নিজ উদ্যোগে ‘পার্কিং নিষেধ’ বোর্ড বসিয়ে রাস্তা অবমুক্ত রেখেছে।

হল প্রশাসক মো. মাহবুব মিয়া বলেন, ‘আগে যায়যায়দিন পত্রিকা অফিস থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সামনের রাস্তা পুরোটা গ্যারেজে পরিণত হয়েছিল। প্রতিদিন গাঁজার আসর বসত। পরে প্রশাসনের নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এখন এক পাশ মুক্ত, কিন্তু অপর পাশে আবার গ্যারেজ বসেছে।’

তেজগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কও অনলাইন শপ ‘দারাজ’-এর কাভার্ড ভ্যান দখল করে রেখেছে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, যিনি ঢাকা-১২ আসন থেকে দলীয় মনোনয়নে এমপি পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ট্রাক রেখে রাস্তা দখল। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি এই এলাকার মাদক ও চাঁদাবাজি বন্ধে ভূমিকা রাখব।’ 

এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. ইসমাইল হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি দশ বছর ধরে বেগুনবাড়িতে আছি। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শক্তির পতন হলেও রাজনৈতিক দখলদারত্ব শেষ হয়নি। জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটি ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করব।’

২৪ নম্বর ওয়ার্ড সচিব আনোয়ারুল কবির জানান, ‘আমি সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারি না। অভিযোগ এলে জোন অফিসে জানাই, তাদের নির্দেশেই পদক্ষেপ হয়।’

অঞ্চল-৩-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. জুলকার নায়ন বলেন, ‘সড়ক দখলমুক্ত করতে হেড অফিসে উচ্ছেদ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে অভিযান চালানো হবে।’

তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, এসব উদ্যোগ আবারও রাজনৈতিক সমীকরণে থেমে যাবে। কারণ এই এলাকায় সড়ক দখল শুধু ব্যবসা নয়, এটি এখন এক ধরনের ক্ষমতার প্রতীক।

গণঅভ্যুত্থানে গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। অবকাঠামো ছাড়া সবকিছুই পুড়ে যায়। এর দুই মাস পর দপ্তরটি পুনরায় খোলে। এখন সেখানে চলছে সংস্কার- দরজা-জানালা মেরামত, বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিক করা, পোড়ার দাগ ঢাকতে চলছে রং-রোগান। 

অন্যদিকে প্রতিদিনের দখলে, অব্যবস্থাপনায়, আর নীরব প্রশাসনিক উদাসীনতায় বেদখল চলছেই। পথচারী হাঁটার পথটুকু পাচ্ছে না। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা